বিশ্বকাপের ইতিহাসে বেলজিয়াম ও সেনেগালের পথচলা একেবারেই ভিন্ন। ইউরোপের অন্যতম ধারাবাহিক দল বেলজিয়াম বহু দশক ধরেই বিশ্বকাপের পরিচিত মুখ। ২০১৮ সালে তৃতীয় হয়ে নিজেদের সেরা সাফল্য ছুঁয়েছিল তারা, যদিও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিয়ে হতাশ করেছিল সমর্থকদের। অন্যদিকে সেনেগালের বিশ্বকাপ ইতিহাস দীর্ঘ না হলেও রোমাঞ্চে ভরপুর।
২০০২ সালে অভিষেক বিশ্বকাপেই তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল আফ্রিকার দেশটি। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ-৩২ পর্বে এই দুই ভিন্ন ইতিহাসের দুই দল প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। তাই সিয়াটলের এই লড়াই শুধু শেষ ষোলোর টিকেটের নয় বরং দুই ফুটবল দর্শনেরও পরীক্ষা।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বেলজিয়াম গ্রুপ ‘জি’-এর চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট নিশ্চিত করেছে। তবে রুডি গার্সিয়ার দলের গ্রুপপর্ব মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। প্রথম ম্যাচে মিসরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে সমালোচনার মুখে পড়ে তারা।
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, এই দলটি আদৌ শিরোপার দাবিদার কি না। তবে শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে সেই প্রশ্নের জোরালো উত্তর দেয় বেলজিয়াম। তিন ম্যাচে এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। ছয় গোল করার পাশাপাশি মাত্র দুই গোল হজম করেছে ইউরোপের দলটি।
অন্যদিকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫তম স্থানে থাকা সেনেগালের পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন। গ্রুপ ‘আই’-এ প্রথম দুই ম্যাচে ফ্রান্স ও নরওয়ের কাছে হেরে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল পাপে থিয়াওয়ের দল। কিন্তু শেষ ম্যাচে ইরাককে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শুধু নকআউটই নিশ্চিত করেনি, গড়েছে বিশ্বকাপের নতুন ইতিহাসও।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোনো আফ্রিকান দল এক ম্যাচে পাঁচ গোল করার কীর্তি গড়ে ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’। সেই জয়েই সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ-৩২ পর্বে জায়গা করে নেয় তারা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের দিকে তাকালে বেলজিয়াম অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ১৯৩০ সাল থেকে নিয়মিত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটি ১৯৮৬ সালে সেমিফাইনালে উঠেছিল। এরপর ২০১৮ সালে তৃতীয় হয়ে নিজেদের সেরা সাফল্য পায়। তবে গত বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর এবার নতুন প্রজন্ম নিয়ে আবারও বড় স্বপ্ন দেখছে তারা।
অন্যদিকে সেনেগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল। এরপর ২০২২ সালে শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোতে পারেনি তারা। এবার সেই সীমা অতিক্রম করাই আফ্রিকার অন্যতম সেরা দলটির লক্ষ্য। ইতিমধ্যে শেষ-৩২ পর্বে ওঠা ৯টি আফ্রিকান দলের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা বিদায় নিয়েছে। ফলে পুরো মহাদেশের বড় আশা এখন সেনেগালের দিকেই।
দুই দলের শক্তিমত্তা বিবেচনা করলে কাগজে-কলমে এগিয়ে বেলজিয়াম। থিবো কোর্তোয়ার মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষক, কেভিন ডি ব্রুইনার অসাধারণ সৃজনশীলতা, রোমেলু লুকাকুর গোল করার ক্ষমতা এবং লিয়ান্দ্রো ট্রোসারের দুর্দান্ত ফর্ম তাদের বড় সম্পদ। গ্রুপপর্বে ট্রোসার দুটি গোল করেছেন। ডি ব্রুইনা, লুকাকু ও আলেক্সিস সালেমেকার্স একটি করে গোল করেছেন। অর্থাৎ গোলের জন্য তারা কোনো একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
সেনেগালের শক্তি তাদের শারীরিক সামর্থ্য, গতি এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। সাদিও মানের অভিজ্ঞতা, ইসমাইলা সারের বিস্ফোরক গতি এবং মাঝমাঠের লড়াকু মানসিকতা যেকোনো প্রতিপক্ষকে ভোগাতে পারে। তবে রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং ধারাবাহিকতার অভাব তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ।
দলীয় খবরেও রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট। বেলজিয়ামের স্কোয়াড প্রায় পূর্ণ শক্তির। ১১২ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া প্রথম একাদশে থাকছেন নিশ্চিতভাবেই।
তবে ডিফেন্ডার জেনো ডেবাস্ট পায়ের চোটের কারণে এখনও পুরোপুরি ফিট নন। যদিও তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলনে ফিরেছেন এবং ম্যাচের আগে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে খেলতে পারেন। ফুল-ব্যাকে টিমোথি কাস্তান ও ম্যাক্সিম ডে কুইপারকে দেখা যেতে পারে, আর কেন্দ্রীয় রক্ষণে থাকবেন আর্থার থিয়াতে।
অন্যদিকে সেনেগাল বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডির চোটে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পাওয়ার পর তিনি চিকিৎসার জন্য সৌদি আরবের ক্লাব আল-আহলিতে ফিরে গেছেন। ফলে এই ম্যাচে তার খেলার সম্ভাবনা অত্যন্তক্ষীণ।
এ ছাড়া অভিজ্ঞ অধিনায়ক কালিদু কুলিবালিও প্রথম একাদশে থাকবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। নরওয়ের বিপক্ষে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর ইরাকের বিপক্ষে সুযোগ পেয়ে দুর্দান্ত খেলেছেন আবদুলায়ে সেক, ফলে তাকেই শুরু থেকে খেলানোর সম্ভাবনা বেশি।
ম্যাচের আগে বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া বলেছেন, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি কিন্তু আমাদের সেরাটা এখনও দেখা যায়নি। নকআউটে ভুলের সুযোগ নেই। সেনেগাল অত্যন্ত বিপজ্জনক দল এবং তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েই খেলতে হবে।
সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াওয়ের কণ্ঠেও আত্মবিশ্বাস, ‘র্যাঙ্কিং কিংবা অতীতের ইতিহাস ম্যাচ জেতায় না। আমরা জানি বেলজিয়াম কতটা শক্তিশালী, তবে আমাদেরও ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা ভয় নিয়ে নয়, বিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামব।’
এই ম্যাচে নজর থাকবে কয়েকজন তারকার দিকে। বেলজিয়ামের হয়ে কেভিন ডি ব্রুইনা হবেন আক্রমণের মূল কারিগর। তার নিখুঁত পাস, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দূরপাল্লার শট ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। সামনে থাকবেন রোমেলু লুকাকু এবং দুর্দান্ত ফর্মে থাকা লিয়ান্দ্রো ট্রোসার। অন্যদিকে সেনেগালের সবচেয়ে বড় ভরসা সাদিও মানে ও ইসমাইলা সার।
বিশেষ করে সারের গতি বেলজিয়ামের রক্ষণকে চাপে ফেলতে পারে, আর মানের অভিজ্ঞতা যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং মাঝমাঠের মান বিবেচনায় কিছুটা এগিয়ে বেলজিয়াম।
তবে সেনেগাল যদি তাদের রক্ষণকে সংগঠিত রাখতে পারে এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তা হলে ইউরোপের দলটিকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে। তবুও কেভিন ডি ব্রুইনার নেতৃত্বে বেলজিয়ামের সৃজনশীল মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/এসএকে