বিশ্বকাপ ফুটবলের শতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম বড় এবং অবিশ্বাস্য এক অঘটনের সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী। র্যাংকিং, শক্তি, ঐতিহ্য আর সামর্থ্যে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারের চরম নাটকীয়তায় হেরে বিশ্বকাপ থেকে চোখের জলে বিদায় নিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি।
বোস্টন স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টাইব্রেকারে সাডেন ডেথে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকেট কেটেছে প্যারাগুয়ে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে জার্মানি কখনো টাইব্রেকারে হারেনি। এমন এক অবিশ্বাস্য ও ইস্পাতকঠিন রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন এক ইতিহাস লিখল লাতিন আমেরিকার এই দেশটি। শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার জার্মানির মতো পরাশক্তির এমন আকস্মিক ও ট্র্যাজিক পতন পুরো ফুটবল দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
বোস্টন স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই ফেবারিট জার্মানির সঙ্গে সমানতালে টেক্কা দিতে থাকে লড়াকু প্যারাগুয়ে। ম্যাচের প্রথমার্ধে জুলিয়ান নাগেলসমানের শিষ্যরা মাঠে চেনা ছন্দে ফিরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। জার্মানদের এমন নিষ্প্রভ ফুটবলের সুযোগ পুরোদমে কাজে লাগায় প্যারাগুয়ে। একের পর এক আক্রমণে জার্মান রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত রেখে ম্যাচের ৪২ মিনিটে প্রথম সাফল্য পায় তারা। ডিলন ববিলের চমৎকার ক্রস থেকে উড়ন্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন হুলিও এনসিসো। পুরো স্টেডিয়াম তখন প্যারাগুয়ের উল্লাসে প্রকম্পিত, আর ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে জার্মানি।
তবে বিরতি থেকে ফিরেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ম্যাচের ৫৩ মিনিটে জার্মানিকে সমতায় ফেরান তারকা ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টজ। সমতা ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেয় জার্মানি। ম্যাচের ৭৭ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন হাভার্টজ। তবে তার দুর্দান্ত এক হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-১ সমতা নিয়ে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের ১০২ মিনিটে ম্যাচে চরম নাটকীয়তা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একটি কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে চমৎকার হেড করে জার্মানিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন ডিফেন্ডার জোনাথান তাহ। জার্মান শিবির যখন উদযাপনে মত্ত, ঠিক তখনই বাধা হয়ে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত।
প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে ফাউল করার অপরাধে ভিএআর দেখে গোলটি বাতিল করে দেন রেফারি। ফলে জার্মানির উল্লাস মুহূর্তেই হতাশায় রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটেও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য রেফারি টাইব্রেকারের বাঁশি বাজান।
টাইব্রেকারে দুই দলের স্নায়ুর পরীক্ষা যেন রূপ নেয় এক রোমাঞ্চকর থ্রিলারে। প্রথম পাঁচ শটের লড়াইতে জার্মানির হয়ে প্রথম শটেই গোল করতে ব্যর্থ হন কাই হাভার্টজ এবং চতুর্থ শটে মিস করেন উলটেমাডে। জার্মানির দুটি মিসের পর প্যারাগুয়ের সামনে জয়ের সহজ সুযোগ এলেও তারা নিজেদের চতুর্থ ও পঞ্চম শট মিস করে বসে। ফলে সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় সাডেন ডেথে। সেখানে জার্মানির হয়ে ভাগ্যনির্ধারণী ষষ্ঠ শট নিতে এসে মিস করে বসেন জোনাথান তাহ।
কিন্তু প্যারাগুয়ের ক্যানালে কোনো ভুল করেননি; নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়েই পুরো দলকে নিয়ে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি। ডাচদের বিদায়ের পর জার্মানির মতো মহাশক্তিশালী দলের এই ঐতিহাসিক পতন এবারের বিশ্বকাপকে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রাখল।
সময়ের আলো/এসএকে