৩২ কোটির সেতুতে ৯০ কোটি টোল, তবু থামছে না আদায়!

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্যে সাঙ্গু নদীর ওপর নির্মিত তৈলারদ্বীপ সেতু। ২০০৬ সালে সেতুটি চালুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে টোল

2026-07-01T18:52:05+00:00
2026-07-01T18:52:05+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
৩২ কোটির সেতুতে ৯০ কোটি টোল, তবু থামছে না আদায়!
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫২ পিএম 
চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্যে সাঙ্গু নদীর ওপর নির্মিত তৈলারদ্বীপ সেতু
চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্যে সাঙ্গু নদীর ওপর নির্মিত তৈলারদ্বীপ সেতু। ২০০৬ সালে সেতুটি চালুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে টোল আদায় করে আসছিল সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর জনবিক্ষোভের মুখে এই সেতুর টোল আদায় বন্ধ হয়ে যায়।

প্রায় এক বছর দশ মাসের বেশি সময় টোল আদায় বন্ধ থাকার পর আবারও ইজারা কোটেশন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ। মঙ্গলবার (৩০ জুন) ইজারা কোটেশনের বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর যাত্রী-বিভিন্ন যানবাহনের চালকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে বাড়ছে অসন্তোষ বাড়ছে।

বাঁশখালীর পুঁইছড়ি থেকে চট্টগ্রাম শহরে নিয়মিত যাতায়াত করেন শামিম উল্লাহ আদিল। তৈলারদ্বীপ সেতুতে টোল বন্ধ হওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন, অন্তত যাতায়াত খরচ কিছুটা কমবে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। টোল বন্ধ হলেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া কমেনি। বরং বৃহস্পতি ও শুক্রবারে দ্বিগুণ, আর ঈদের সময় তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তাঁর।

শামিম উল্লাহ আদিল বলেন, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু টোল নিয়ে নয়, ভাড়া নিয়েও। টোল বন্ধ থাকার পরও চালকেরা এক টাকাও ভাড়া কমাননি। যাত্রী হয়রানিও বন্ধ হয়নি। তাই সরকারের রাজস্ব আদায়ে জনগণের সহযোগিতা করা উচিত।

তবে শামিমের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বাঁশখালীর অনেক বাসিন্দা। তাঁদের বক্তব্য, ৩২ কোটি টাকায় নির্মিত একটি সেতু থেকে ১৮ বছর ধরে টোল আদায় করা হয়েছে। এই সময়ে নির্মাণ ব্যয়ের তিন গুণের বেশি টাকা আদায় হয়েছে। এরপরও একই সেতুতে নতুন করে টোল আদায়ের উদ্যোগ কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার মধ্যে সাঙ্গু নদীর ওপর নির্মিত তৈলারদ্বীপ সেতুতে আবার টোল আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ গত ২৮ জুন সেতুটির টোল আদায়ের জন্য তিন বছর মেয়াদি ইজারা কোটেশন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। আগামী ১৯ জুলাই বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোটেশন বিক্রির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ জুলাই চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কার্যালয়ে কোটেশন খোলা হবে।


স্থানীয়দের দাবি, তৈলারদ্বীপ সেতুতে টোল আদায় বন্ধ করা বাঁশখালীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কারণ, সাঙ্গু নদীর ওপর একই ধরনের আরও ছয়টি সেতু থাকলেও সেগুলোতে টোল আদায় করা হয় না। শুধু তৈলারদ্বীপ সেতুতে টোল আদায় করা হচ্ছে। বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজার, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এই সেতু।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫১২ মিটার দীর্ঘ তৈলারদ্বীপ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০০১ সালের ১৭ জানুয়ারি। প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ শেষে ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর ১৮ বছরে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টোল আদায় করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই সময়ে ৯০ কোটি টাকার বেশি আদায় হয়েছে, যা নির্মাণ ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট টোলঘর পুড়িয়ে দেওয়ার পর টোল আদায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে কয়েক দফা টোল আদায়ের চেষ্টা হলেও স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে তা সম্ভব হয়নি। টোল বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে। ৩৫ হাজার মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদনও করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর সেতুটিতে পুনরায় টোল আদায়ের নির্দেশনা দেয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুলতানা রাজিয়া স্বাক্ষরিত চিঠিতে টোল আদায়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে উদ্যোগ নিতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে গণশুনানি করে।

বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্থানীয় লোকজনের বক্তব্য শোনেন। গণশুনানিতে টোল বন্ধের দাবির পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বাঁশখালীর সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তৈলারদ্বীপ সেতুতে টোল আদায় বন্ধ করা বাঁশখালীবাসীর ন্যায্য দাবি। আমিও এই দাবির সঙ্গে একমত। টোল বন্ধের জন্য আমি উচ্চ আদালতে রিটও করেছিলাম।

বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা কামরুল ইসলাম হোসাইনী বলেন, প্রশাসনের গণশুনানিতে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তৈলারদ্বীপ সেতুতে টোল আদায় বন্ধ করা জনগণের যৌক্তিক দাবি। সেখানে আমি বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছিলাম।

তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত সরকারের। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, টোল নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের। আইনের প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। গায়ের জোরে কিছু করা যায় না। প্রায় দুই বছর টোল বন্ধ থাকায় জনগণের কী লাভ হয়েছে? ভাড়া তো এক টাকাও কমেনি। টোল আদায় হলে রাজস্ব সরকারি কোষাগারে যাবে।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি টোল বন্ধ করতে চান, সেটি আইনি প্রক্রিয়ায় করতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়া আইন পরিপন্থী। আমরাও চাই টোল বন্ধ হোক, কিন্তু সেটি আইনি প্রক্রিয়ায় হোক। সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ফাইট করার সুযোগ নেই।

নতুন করে টোল আদায়ের উদ্যোগের পর বাঁশখালী ও আনোয়ারার বিভিন্ন এলাকায় আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পক্ষে-বিপক্ষে মত দিচ্ছেন স্থানীয়রা। কেউ বলছেন, দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত সেতু থেকে ১৮ বছর টোল আদায়ের পর আর টোল নেওয়া উচিত নয়। আবার কেউ বলছেন, টোল বন্ধ হলেও পরিবহন ভাড়া না কমায় সাধারণ যাত্রী বাস্তবে কোনো সুবিধা পাননি।

নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

তৈলারদ্বীপ সেতু এখন শুধু একটি টোলঘরের প্রশ্ন নয়। এটি একদিকে সরকারি রাজস্ব আদায়ের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের স্থানীয় ক্ষোভ ও ন্যায্যতার দাবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একটি জনস্বার্থের ইস্যু। ৩২ কোটি টাকার সেতু থেকে ১৮ বছরে কত টাকা আদায় হয়েছে, সেই অর্থ কোথায় গেছে, এখনো টোল আদায়ের যুক্তি কী- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না মিললে এই বিতর্ক সহজে থামবে না।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  বাঁশখালী  আনোয়ারা  উপজেলা  সাঙ্গু নদী  তৈলারদ্বীপ  সেতু 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: