বিশ্বকাপের মঞ্চে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার পথচলার গল্প আলাদা কিন্তু লক্ষ্য এক- ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি জয়। ১৯৬৬ সালে কিংবদন্তি ইউসেবিওর হাত ধরে তৃতীয় হওয়াই এখনও বিশ্বকাপে পর্তুগালের সেরা সাফল্য। এরপর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্বে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হলেও বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে গেছে।
অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাত্র তিন দশকের পথচলায় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে ক্রোয়েশিয়া। ২০১৮ সালে রানার্সআপ এবং ২০২২ সালে তৃতীয় হয়ে তারা প্রমাণ করেছে, বড় টুর্নামেন্টে তাদের ধারাবাহিকতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। সেই দুই ইউরোপীয় শক্তিই এবার মুখোমুখি ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ-৩২ পর্বে। শুক্রবার ভোর ৫টায় কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াই।
গ্রুপপর্বে প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা ছন্দহীন ছিল রবার্টো মার্টিনেজের পর্তুগাল। গ্রুপ ‘কে’-এর প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে তারা। পুরো ম্যাচে আক্রমণে খুব বেশি কার্যকর ছিল না পর্তুগিজরা; তাদের প্রত্যাশিত গোল গড় ছিল মাত্র ০.৬৫, যেখানে প্রতিপক্ষের ছিল ০.৮৭। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ঘুরে দাঁড়ায় পর্তুগাল। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করায় ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবেই নকআউট নিশ্চিত করে তারা। ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় কলম্বিয়া।
অন্যদিকে গ্রুপ ‘এল’-এ প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হারের পর চাপে পড়ে যায় জ্লাতকো দালিচের ক্রোয়েশিয়া। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। শেষ ম্যাচে ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে শেষ-৩২ নিশ্চিত করে ক্রোয়াটরা। সেই ম্যাচে নিকোলা ভ্লাসিচের জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে অ্যাসিস্ট করা ফুটবলার হওয়ার কীর্তি গড়েন লুকা মদরিচ।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান খুব বেশি নয়। পর্তুগাল রয়েছে পঞ্চম স্থানে আর ক্রোয়েশিয়া একাদশে। পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের তারকাবহুল স্কোয়াড। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেস, ভিতিনিয়া, রাফায়েল লেয়াও, জোয়াও নেভেস, নুনো মেন্দেস ও রুবেন দিয়াস প্রায় প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে বিশ্বমানের ফুটবলার। দ্রুতগতির আক্রমণ, সৃজনশীল মিডফিল্ড এবং শক্তিশালী রক্ষণ তাদের বড় সম্পদ।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার মূল শক্তি অভিজ্ঞতা, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। লুকা মদরিচ, মাতেও কোভাচিচ ও পেতার সুচিচের সমন্বয়ে গড়া মিডফিল্ড যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রক্ষণে যশকো গভার্দিওল এবং আক্রমণে ইভান পেরিসিচ ও নিকোলা ভ্লাসিচও হতে পারেন পার্থক্য গড়ে দেওয়া ফুটবলার। এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে দুই কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচের দিকে।
৪১ বছর বয়সেও রোনালদো গ্রুপপর্বে দুই গোল করে দেখিয়েছেন, বড় ম্যাচে তিনি এখনও পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা। অন্যদিকে ৪০ বছর বয়সি মদরিচ এখনও ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের প্রাণভোমরা। তার অভিজ্ঞতা, নিখুঁত পাসিং ও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পাশাপাশি ব্রুনো ফার্নান্দেস, ভিতিনিয়া, যশকো গভার্দিওল, মাতেও কোভাচিচ ও নিকোলা ভ্লাসিচের পারফরম্যান্সও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই দলের জন্যই স্বস্তির খবর, নকআউট পর্বের আগে নতুন কোনো ইনজুরির সমস্যা নেই। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর পর্তুগাল পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঝমাঠে জোয়াও নেভেস আবারও শুরুর একাদশে ফিরতে পারেন। আক্রমণের নেতৃত্বে থাকবেন রোনালদো। রক্ষণে নুনো মেন্দেস, রুবেন দিয়াস, রেনাতো ভেইগা ও জোয়াও ক্যানসেলো এবং গোলবারের নিচে দিয়োগো কস্তাকে দেখা যেতে পারে। ক্রোয়েশিয়াও প্রায় পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামতে যাচ্ছে।
শেষ ম্যাচে বিশ্রামে থাকা যশকো গভার্দিওল একাদশে ফিরতে পারেন। মাঝমাঠে মদরিচের সঙ্গে মাতেও কোভাচিচ ও পেতার সুচিচকে দেখা যেতে পারে। ঘানার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা নিকোলা ভ্লাসিচও শুরুর একাদশে জায়গা ধরে রাখার দৌড়ে এগিয়ে।
ম্যাচের আগে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেছেন, গ্রুপপর্বে আমাদের পারফরম্যান্স নিয়ে বাইরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু দলের ভেতরে আমাদের প্রত্যাশা ও তাগিদ বাইরের সমালোচনার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা কৌশলগতভাবে নমনীয় এবং বিশ্বাস করি, ফুটবল সবসময়ই একটি দলগত খেলা। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেছেন, পর্তুগাল বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। তবে বড় টুর্নামেন্টে আমরা আগেও কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়েছি। আমাদের অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যান অবশ্য পর্তুগালের পক্ষেই কথা বলে। দুই দলের ১০টি সাক্ষাতের মধ্যে সাতটিতে জয় পেয়েছে পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়ার জয় মাত্র একটিতে আর দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সর্বশেষ ছয় লড়াইয়ের পাঁচটিতেই জয় পেয়েছে সেলেসাওরা। সবচেয়ে স্মরণীয় জয়টি আসে ইউরো ২০১৬-এর শেষ ষোলোতে, যখন অতিরিক্ত সময়ে রিকার্দো কুয়ারেসমার গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পথে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। তবে ২০২৪ সালের উয়েফা নেশন্স লিগে দুই দল ১-১ গোলে ড্র করেছিল, যা প্রমাণ করে অতীতের পরিসংখ্যান এই ম্যাচে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
সব মিলিয়ে এটি শেষ-৩২ পর্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ। একদিকে বিশ্বকাপ জয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে শেষ অভিযানে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে আরেকটি রূপকথা লেখার অপেক্ষায় লুকা মদরিচ। পর্তুগালের তারকাসমৃদ্ধ আক্রমণভাগের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল। দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এই লড়াইয়ে একটি মুহূর্তের জাদু কিংবা একটি ছোট ভুলই নির্ধারণ করে দিতে পারে শেষ ষোলোর টিকেট।
সময়ের আলো/আআ