বজ্রঝড়ে ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়েছিল এক ঘণ্টা। কিন্তু প্রকৃতি শান্ত হওয়ার পর যেন ঝড় নামল সবুজ ঘাসের মাঠে। গ্যালারিভর্তি ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের গর্জনের মধ্যে দুরন্ত গতির ফুটবল উপহার দিয়ে ইকুয়েডরকে প্রথমার্ধেই দুই গোলের ধাক্কা দেয় মেক্সিকো। সেই ব্যবধান ধরে রেখে ২-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নেয় স্বাগতিকরা। এই জয়ে শুধু বিশ্বকাপের শেষ ষোলোই নিশ্চিত হয়নি, ভেঙেছে চার দশকের দীর্ঘ অভিশাপও। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পেল মেক্সিকো আর আজতেকা স্টেডিয়াম আবারও সাক্ষী হয় দেশটির ফুটবল ইতিহাসের এক স্মরণীয় রাতের।
মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। আনুষ্ঠানিক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৮০ হাজার ৮২৪ জন দর্শক। বজ্রঝড়ের কারণে খেলা শুরু হতে এক ঘণ্টা দেরি হলেও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে এতটুকু ভাটা পড়েনি। আর মাঠে নামার পর সেই ভালোবাসার প্রতিদান দেয় মেক্সিকো। ম্যাচের শুরু থেকেই ইকুয়েডরের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে স্বাগতিকরা। ষষ্ঠ মিনিটে লুইস রোমোর নিচু শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। এক মিনিট পর তার নিখুঁত ক্রস থেকে রাউল হিমেনেসের হেডও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মেক্সিকোর গতিময় ফুটবলের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিল ইকুয়েডর।
তবে প্রথম বড় সুযোগটি পেয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলটিই। ১৮ মিনিটে গঞ্জালো প্লাতা প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে জন ইবোয়াকে বল বাড়িয়ে দেন। বক্সে ঢুকে বাঁ-পায়ের জোরালো শট নিলেও বল কাছের পোস্টে লেগে বাইরের জালে আঘাত হানে। সম্ভাবনাময় সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার খেসারত দিতে হয় ইকুয়েডরকে। ২২ মিনিটে দুর্দান্ত একক নৈপুণ্যে মেক্সিকোকে এগিয়ে দেন হুলিয়ান কিনোনেস। ইকুয়েডরের আক্রমণ প্রতিহত করে নিজেদের অর্ধ থেকে দারুণ একটি থ্রু পাস বাড়ান হেসুস গাইয়ার্দো। অফসাইড ফাঁদ ভেঙে বাঁ-দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে বক্সের ভেতর থেকে অপ্রতিরোধ্য শটে বল জালে জড়িয়ে দেন কিনোনেস। গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।
গোলের ধাক্কা সামলানোর আগেই আরও বড় বিপদে পড়ে ইকুয়েডর। রক্ষণভাগের ভুলে বল চলে যায় রাউল হিমেনেসের কাছে। কিনোনেসের সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সের ভেতরে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে পোস্টঘেঁষা নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর কিছুটা গুছিয়ে ওঠে ইকুয়েডর। ৪০ মিনিটে জন ইবোয়ার জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক রাউল রাহনেল। দুই মিনিট পর কর্নার থেকে আসা আরেকটি বিপজ্জনক বলও দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেন তিনি। অন্যদিকে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে হিমেনেসের ভলি অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখলে কিছুটা এগিয়ে ছিল ইকুয়েডর। তবে মেক্সিকোর সুসংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে তারা খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। ৬৭ মিনিটে উল্টো ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পায় মেক্সিকো। সেসার মন্তেসের হেড অসাধারণ রিফ্লেক্সে এক হাতে ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক এর্নান গালিন্দেজ। পরের কর্নার থেকে জোহান ভাসকেসের হেডও অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। শেষ সময় পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেলেও মেক্সিকোর রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি ইকুয়েডর বরং ম্যাচ শেষে বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারিজুড়ে শুরু হয় উৎসব। উল্লাসে ফেটে পড়েন হাজারো সমর্থক, মাঠে নেমে আসে আবেগের জোয়ার।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল মেক্সিকো। তখনকার সেই দলের সদস্য ছিলেন বর্তমান কোচ হাভিয়ের আগিরে। তার হাত ধরেই ভাঙল চার দশকের অপেক্ষা। ১৯৯৪ সাল থেকে টানা সাতটি বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব পেরিয়েও দ্বিতীয় ধাপের বাধা টপকাতে না পারার হতাশাও এবার ঘুচল।
সময়ের আলো/আআ