লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে সাতক্ষীরার ২০ লাখ মানুষ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সারাদেশ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি

2026-07-02T17:52:58+00:00
2026-07-02T17:53:43+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে সাতক্ষীরার ২০ লাখ মানুষ
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫২ পিএম  আপডেট: ০২.০৭.২০২৬ ৫:৫৩ পিএম
সাতক্ষীরার ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ। ছবি : সময়ের আলো
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দিনদিন বেড়ে চলা লবণাক্ততা- জেলার কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭ টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার চাষযোগ্য জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন লাখো মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাতক্ষীরার প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এরমধ্যে কৃষি নির্ভর পরিবার, মৎস্যজীবী, দিনমজুর ও নারী কৃষি শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা প্রতিবছরই বাড়ছে। ফলে ধান, গম, ডাল, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ মাঠে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন হলেও বর্তমানে অনেক জমিতে মাত্র একটি লবণসহিষ্ণু ধান চাষ সম্ভব হচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষি জমিকে চিংড়ি ঘেরে রূপান্তর করছেন। এতে একদিকে খাদ্য শস্য উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে মাটির স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। নিরাপদ পানির সংকটও দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। লবণাক্ততার কারণে পুকুর, খাল ও অগভীর নলকূপের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে সুপেয় পানি কিনতে হচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


এ অবস্থায় পরিবেশবান্ধব কৃষি, সমন্বিত চাষাবাদ এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সাতক্ষীরা শহরের ম্যানগ্রোভ সভাঘরে সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা আয়োজিত ‘খাদ্য ব্যবস্থা, উপকূলীয় বাস্তবতা ও এগ্রো ইকোলজি : ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই ভবিষ্যতের সন্ধানে’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে বক্তারা বলেন, ‘উপকূলীয় বাস্তবতায় কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকৃতিবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থার বিকল্প নেই।’

গ্রীন কোয়ালিশন (সবুজ সংহতি) সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু আফফান রোজ বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা তথ্য কর্মকর্তা জাহারুল ইসলাম।


সাতক্ষীরা খামারবাড়ির কৃষি কর্মকতা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিকূলতার মধ্যেও সাতক্ষীরার কৃষিতে সম্ভাবনার দুয়ার এখনও উন্মুক্ত। লবণসহিষ্ণু ধান ও অন্যান্য ফসলের সম্প্রসারণ, জৈব কৃষি, সমন্বিত মাছ-ফস লচাষ, ভাসমান কৃষি, ফল ও সবজির বহুমুখী আবাদ এবং স্থানীয় বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল পুনঃখনন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।’

কৃষিবিদদের মতে, ‘সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। এজন্য লবণ সহিষ্ণু ফসলের গবেষণা ও সম্প্রসারণ, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ ও ফসল বীমা চালু, নারী কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি।’

একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি, সমন্বিত চাষাবাদ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণ, সরকার ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সাতক্ষীরার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরার কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   লবণাক্ততা  জলবায়ু  পরিবর্তন  ঝুঁকি  সাতক্ষীরা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: