‘সরকারি মাল দরিয়ায় ঢাল’ জনপ্রিয় এই প্রবাদটিই যেন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলওয়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মাহমুদা খাতুন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়ের পানির ট্যাংক, ফ্যান ও সৌরবিদ্যুতের প্যানেলসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পদ নিজের ব্যক্তিগত জিম্মায় নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, এই অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষিকাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের মাধ্যমে চরম হয়রানি ও হেনস্তা করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই মাঠপর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
চলতি বছরের ১৪ জুন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা লুৎফুর নাহার ও সিনথিয়া আফরিন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে এই প্রশাসনিক অসঙ্গতি ও হয়রানির চিত্র তুলে ধরে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সম্পদ লোপাট ছাড়াও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি ও সনদপত্রের নামে অবৈধ অর্থ আদায়, জাতীয় দিবসের বরাদ্দের অপব্যবহার, টিফিন কর্মসূচিতে অনিয়ম এবং সাব-ক্লাস্টার প্রশিক্ষণের নামে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে চাঁদা দাবি করারও অভিযোগ রয়েছে ওই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকারা জানান, শুধু প্রশাসনিক অনিয়মই নয়, তাদের মানসিকভাবে হেনস্তা করতে স্কুল মাঠে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা তদারকি ও ফলাফল শিট পর্যালোচনার ছবি-ভিডিও গোপনে ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে তা প্রধান শিক্ষকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ক্লাস বাদ দিয়ে গল্প চলছে’ এমন আপত্তিকর মন্তব্যসহ ছড়িয়ে দিয়ে তীব্র হয়রানি করা হয়। এতে তারা চরম সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মাহমুদা খাতুন দাবি করেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ মিথ্যা। তাছাড়া বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।
তবে সরকারি সম্পদ বাড়িতে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রমজান মাসে দুটি পানির ট্যাংক নষ্ট হলে নিরাপত্তার স্বার্থে শিক্ষা অফিসারকে জানিয়ে তা নিজ বাড়িতে রাখি। আর কিছু নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য মেকানিককে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, সরকারি সম্পদ যথাযথ অনুমোদন বা নথিপত্র ছাড়া ব্যক্তিগত জিম্মায় রাখা কতটুকু বিধিসম্মত তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকা বিভিন্ন মহলে জোর তদবির চালাচ্ছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর মো. শাহিদুল ইসলাম জানান, গত ১৭ জুন শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ের ১৫৪ নম্বর স্মারকে তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে আমি ২৩ ও ৩০ জুন দুই দফায় সরজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত পরিচালনা করেছি। বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সুষ্ঠু প্রতিবেদনের স্বার্থে আরও কিছুটা সময় লাগবে, তাই এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আফজাল হোসেন জানান, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/আতা