ফুটবলপ্রেমীদের একটা মস্ত বড় অভ্যাস আছে, তারা অতীতকে সহজে ভুলতে পারে না। আর তাই তো চায়ের আড্ডায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেওয়ালে আজও ‘মেসি নাকি রোনালদো?’-এই চিরন্তন দ্বৈরথ নিয়ে চায়ের কাপে তুফান ওঠে। অথচ রূঢ় বাস্তব হলো, সেই পুরোনো লড়াইয়ের গায়ে বহু আগেই শেওলা জমে গেছে। পর্দার আড়ালে গত আট বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন নিয়ে যে মরণপণ যুদ্ধটা চলছে, তা বড্ড নীরবে-অলক্ষ্যে ঘটে চলেছে। এই লড়াইটি আসলে লিওনেল মেসি বনাম কিলিয়ান এমবাপ্পের! ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে কাজানের সেই রোমাঞ্চকর প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে যে গল্পের শুরু, তা কাতার হয়ে এবার এসে ঠেকেছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। কে কার চেয়ে বেশি গোল করে নিজেকে উঁচুতে নিয়ে যাবেন, সেই ইঁদুর-দৌড়ে মেসি যদি চলেন পাতায় পাতায়, তবে এমবাপ্পে চলছেন ডালে ডালে। সম্প্রতি সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করা ফ্রান্সের অধিনায়কের সামনে এখন কেবলই ‘গোল্ডেন বুট’-এর হাতছানি।
লুসাইল থ্রিলারের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, মেসির অমর কীর্তির ছায়ায় হয়তো কিছুটা ম্লান হয়ে যাবেন এমবাপ্পে। কিন্তু ফরাসি রাজপুত্রের অভিধানে ‘থেমে যাওয়া’ শব্দটার কোনো অস্তিত্ব নেই। চলমান বিশ্বকাপে গোলদাতার তালিকায় মেসি যখন ৬টি গোল দিয়ে রাজত্ব করছেন, নিউ জার্সিতে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এমবাপ্পে ঠিক তার ঘাড়ের ওপর এসে সমান্তরালে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, সমান ৬ গোল হলেও ২টি অ্যাসিস্টের সুবাদে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এলএমটেনকে টপকে এখন শীর্ষে এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচের ৪৫তম মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে চিতার গতিতে বক্সে ঢুকে পড়েন এমবাপ্পে। চারজন ডিফেন্ডার তাকে বৃত্তাকারে ঘিরে ধরলেও শরীরটাকে সামান্য একটু দুলিয়ে চোখের পলকে ডান পায়ের কোনাকুনি বুলেটের মতো শটে বল জালে জড়ান। এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার রেকর্ড ৯ম গোল, যা রোনালদো নাজারিওকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। তবে যার গোলের ক্ষুধা মেটে না, সে কি আর এক গোলে শান্ত থাকে? দ্বিতীয়ার্ধে মাইকেল ওলিসের এক নিখুঁত থ্রু-বল বক্সে পেতেই কোনো ভুল করেননি ফরাসি নাম্বার টেন। চলন্ত বলেই আলতো ছোঁয়ায় সুইডিশ গোলকিপারকে পরাস্ত করে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার মোট গোলসংখ্যা এখন ১৮, যা মেসির অলটাইম রেকর্ডের (১৯ গোল) চেয়ে মাত্র এক ধাপ পেছনে!
এবারের আসরে এখন পর্যন্ত এমবাপ্পের করা ৬টি গোলই যেন একেকটি দর্শনীয় চিত্রকর্ম। গ্রুপ পর্বে সেনেগালের বিরুদ্ধে তার প্রথম গোলটি ছিল দেম্বেলের ভাসানো পাস থেকে বাতাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে চিতার মতো ছুটে গিয়ে চলন্ত বলে করা এক অবিশ্বাস্য ভলি। আর দ্বিতীয় গোলটিতে দেখা গেছে ডান পায়ের ইনসাইড-স্টেপ দিয়ে নেওয়া এক মায়াবী বাঁকানো শট। এরপর ইরাকের বিপক্ষে ‘স্টেপ-ওভারে’ চারজন ডিফেন্ডারকে অবশ করে করেছিলেন প্রথম গোল এবং দ্বিতীয়টি আসে নিখুঁত হেডারে। এভাবেই প্রতিটি ম্যাচে গোল করে মেসির ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন তিনি। এই ধারা বজায় থাকলে শেষ ষোলোর পরের ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হয়তো নিজের একসময়কার ক্লাব সতীর্থকে টপকেও যেতে পারেন তিনি।
অবশ্য এসব রেকর্ড নিয়ে ফরাসি রাজপুত্রকে কখনোই বাড়তি আহ্লাদ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। মিডিয়ার নানা উস্কানিমূলক প্রশ্নেও মেসির প্রতি কোনো অসম্মান দেখাননি এমবাপ্পে। তিনি ভালো করেই জানেন, ১০০ মিটার স্প্রিন্টে উসাইন বোল্ট হতে গেলে দৌড়ানোর সময় পাশের প্রতিযোগীর দিকে তাকাতে নেই। তাই ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এক শান্ত এমবাপ্পে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘লিও (মেসি) ফুটবল ইতিহাসের এক পরম বিস্ময়। তার রেকর্ডের পাশে নিজের নাম দেখাটাও একটা বিরাট সম্মান। কিন্তু আমি সব সময় বলি, রেকর্ড তো তৈরিই হয় কোনো না কোনো দিন ভেঙে যাওয়ার জন্য! মাঠে যখন নামি, তখন কার কত গোল, তা নিয়ে ভাবি না। আমার একমাত্র লক্ষ্য থাকে ফ্রান্সকে জেতানো এবং এই বিশ্বকাপটা আবার প্যারিসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।’
ঠান্ডা মাথার এই ফরাসি অধিনায়কের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তার সামনে মাথা ঝুঁকিয়েছেন খোদ কোচ দিদিয়ের দেশমও। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে একগাল হেসে ফরাসি গুরু বলেন, ‘কিলিয়ান যখন মাঠে ওর গতিতে ছুটতে শুরু করে, তখন ডাগআউটে বসে থাকা আমার মতো বুড়ো কোচের শরীরেও কাঁটা দেয়। ও শুধু গোল করে না; ও যেভাবে দলটাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, ওর মাথা এখন এতটাই শান্ত যে ও একাই যে কোনো ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিতে পারে। আমি ওর সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছি।’ মূলত বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটিই যে তাঁর পাখির চোখ, সেটি খোলামেলাভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন এমবাপ্পে। সেখানে ‘গোল্ডেন বুট’ তার মুকুটের একটি চূড়া মাত্র, তার বেশি কিছু নয়।
সময়ের আলো/আরবিএন