ডি-বক্সের ঠিক সামনে বল পায়ে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। চোখ গোলপোস্টে, মুহূর্তেই বেরিয়ে আসতে পারে তার চেনা বাঁ-পায়ের জাদুকরী শট। আর গোলবারের নিচে দুই হাত মেলে প্রস্তুত ৪০ বছর বয়সি ভোজিনহা। যার দৃঢ় হাতে ইতিমধ্যেই থমকে গেছে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তির আক্রমণ। ফুটবলপ্রেমীরা এর চেয়ে আকর্ষণীয় দ্বৈরথ আর কিবা চাইতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৪টায় বিশ্বকাপের শেষ-৩২ পর্বে এমনই এক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমক, অঘটনের নতুন নাম কেপভার্দে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, নকআউট পর্বে অতীতের অর্জন কিংবা কাগজে-কলমের শক্তির হিসাব সবসময় মেলে না। এখানেই জন্ম নিয়েছে সেনেগালের ফ্রান্স-বধ, দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালের স্বপ্নযাত্রা, মরক্কোর ঐতিহাসিক অভিযান কিংবা ক্রোয়েশিয়ার বিস্ময়কর উত্থানের মতো গল্প। সেই আবহেই এবার নিজেদের নাম লিখিয়েছে কেপভার্দে। বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণেই তারা দেখিয়ে দিয়েছে, ছোট দেশের স্বপ্নও বিশ্বমঞ্চে বড় হয়ে উঠতে পারে। তবে রূপকথার পরের অধ্যায় লিখতে হলে এবার তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবচেয়ে বড় বাধা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
এটি এমন এক লড়াই, যেখানে এক পাশে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। যাদের গৌরবগাথা রচনা করেছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিরা। অন্য পাশে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপভার্দে। যাদের বিশ্বকাপ অভিষেকই পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত রূপকথায়। তাই এই ম্যাচ কেবল ফেবারিট আর আন্ডারডগের দ্বৈরথ নয়; এটি ইতিহাসের গর্জনের বিপরীতে সাহসের নিঃশব্দ উচ্চারণ। একদিকে বিশ্বজয়ের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার ক্ষুধা।
আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন একদিকে লিওনেল মেসি, অন্যদিকে অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে শুরু থেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। ‘জে’ গ্রুপে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। গ্রুপপর্বে শতভাগ জয়ের কীর্তি গড়েছে মাত্র তিনটি দল আর্জেন্টিনা, সহ-আয়োজক মেক্সিকো ও ফ্রান্স। তিন ম্যাচেই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রিত, আক্রমণাত্মক এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল।
আর্জেন্টিনার এখন পর্যন্ত সফল বিশ্বকাপ অভিযানের প্রাণভোমরা অবশ্যই লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও যেন সময়কে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন তিনি। তিন ম্যাচে ছয় গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন তিনি। আর্জেন্টিনার করা আট গোলের মধ্যে ছয়টিই এসেছে তার পা থেকে। অর্থাৎ দলের মোট গোলের ৭৫ শতাংশেই সরাসরি অবদান অধিনায়কের। শুধু গোল নয়, আক্রমণ গড়ে তোলা, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ। সবকিছুতেই এখনও তিনিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
অন্যদিকে কেপভার্দের গল্পটা যেন একেবারেই অন্যরকম। ২০২৬ বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া চার দলের মধ্যে একমাত্র তারাই জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্বে। ‘এইচ’ গ্রুপে স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়া, উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ ড্র এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটি ক্লিন শিট। এই তিন ম্যাচই বদলে দিয়েছে দলটিকে ঘিরে সবার ধারণা।
নকআউটে ওঠা ৩২ দলের মধ্যে সবচেয়ে কম গোল করলেও সবচেয়ে সংগঠিত রক্ষণগুলোর একটি তাদের। ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার বিচারে দুই দলের পার্থক্য বিশাল। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে। আরও তিনবার হয়েছে রানার্সআপ। বিপরীতে কেপভার্দের এটিই বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণ। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও ব্যবধান স্পষ্ট। আর্জেন্টিনা বিশ্বের এক নম্বর দল, কেপভার্দে ৬৭তম। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বারবার শিখিয়েছে, র্যাঙ্কিং কিংবা ইতিহাস নয়, শেষ পর্যন্ত কথা বলে মাঠের পারফরম্যান্স।
আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয় তাদের সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা। ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হারের পর থেকে বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে আর হারেনি স্কালোনির দল। এই সময়ে তারা জিতেছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা মিলিয়ে নকআউট পর্বে তাদের টানা জয়ের সংখ্যা এখন ১০।
দলীয় শক্তির বিচারে আর্জেন্টিনা নিঃসন্দেহে এগিয়ে। মেসির পাশাপাশি লাউতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো দি পল ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর মতো তারকাদের নিয়ে দলটি ভারসাম্যপূর্ণ। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ তিন বিভাগেই রয়েছে বিশ্বমানের ফুটবলার। অন্যদিকে কেপভার্দের শক্তি ব্যক্তিনির্ভর নয় বরং দলগত। ঘন রক্ষণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থান, প্রতিপক্ষকে জায়গা না দেওয়া এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা। এই কৌশলেই তারা স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলকে আটকে দিয়েছে। তাদের রক্ষণ ভাঙতে তাই আর্জেন্টিনাকে ধৈর্য ধরেই খেলতে হবে।
ইনজুরিও ম্যাচটির আগে আলোচনায় রয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। তবে তার চোট গুরুতর নয় এবং এই ম্যাচে শুরুর একাদশে ফেরার সম্ভাবনাই বেশি। জর্ডানের বিপক্ষে বিশ্রামে থাকা লিওনেল মেসি, রদ্রিগো দে পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারও মূল দলে ফিরবেন। কেপভার্দে শিবিরেও কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগে তেলমো আরকানজো, জামিরো মন্টেইরো ও কেভিন লেনিনি চোটে পড়েছিলেন। তবে মন্টেইরো ও লেনিনি সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। কেবল আরকানজোকে নিয়েই কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট সমীহ করে বলেছেন, কেপভার্দের নকআউটে ওঠা আমাকে অবাক করেনি। তারা স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলকে ভুগিয়েছে। তারা আমাদের জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ হবে। অন্যদিকে কেপভার্দের কোচ বুবিস্তা বলেছেন, আমরা অসম্ভবকে ভয় পাই না। ইতিহাস গড়তে এসেছি, এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখতে চাই। সহকারী কোচ হাম্বার্তো বেটেনকোর্ট জানিয়েছেন, মেসিকে আলাদা করে পাহারা দেওয়া হবে না বরং দলগত কৌশলেই তাকে থামানোর চেষ্টা করবে তার দল।
এই ম্যাচে আলাদা করে নজর থাকবে দুই ফুটবলারের ওপর। একদিকে মেসি, যিনি এক মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। অন্যদিকে ভোজিনহা, যিনি স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে বিশ্বকাপের আলোচনায় উঠে এসেছেন। বর্তমানে কোনো ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ না থাকলেও জাতীয় দলের জার্সিতে তার আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব কেপভার্দেকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচয়। পাশাপাশি ডেইলন রোচা লিভ্রামেন্তো, রায়ান মেন্ডেস ও গ্যারি রদ্রিগেসের ওপরও থাকবে গোল করার দায়িত্ব।
কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা বড় ফেবারিট কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস কখনোই শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এই মঞ্চে অসংখ্যবার জন্ম নিয়েছে নতুন নায়ক, ভেঙেছে সব পূর্বাভাস। কেপভার্দে কি সেই তালিকায় নিজেদের নাম যোগ করবে, নাকি মেসির পায়ের জাদুতেই আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা? মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে সেই উত্তর খুঁজবে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
সময়ের আলো/আআ