ধারাভাষ্যের কবি : পিটার ডুরি ও ফুটবল মাঠের কাব্যিক মহাকাব্য

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

সবুজ মাঠের প্রতিটি ঘাস যেন একেকটি চরিত্র, আর চামড়ার বলটি সেই মহাকাব্যিক নাটকের কেন্দ্রীয় নায়ক। ফুটবল খেলাটি কেবল তেইশ সেন্টিমিটার

2026-07-03T15:31:23+00:00
2026-07-03T15:37:33+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
খেলা
ধারাভাষ্যের কবি : পিটার ডুরি ও ফুটবল মাঠের কাব্যিক মহাকাব্য
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩১ পিএম  আপডেট: ০৩.০৭.২০২৬ ৩:৩৭ পিএম
পিটার ডুরি। সংগৃহীত ছবি
সবুজ মাঠের প্রতিটি ঘাস যেন একেকটি চরিত্র, আর চামড়ার বলটি সেই মহাকাব্যিক নাটকের কেন্দ্রীয় নায়ক। ফুটবল খেলাটি কেবল তেইশ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি গোলকের পেছনে বাইশজন মানুষের ছুটে চলা নয়, এটি আসলে মানুষের স্বপ্ন, হাহাকার আর পরম প্রাপ্তির এক জীবন্ত নাট্যমঞ্চ। আর এই নাট্যমঞ্চকে যখন কোনো জাদুকর তার শব্দের অনন্য তুলি দিয়ে জীবন্ত ক্যানভাসে রূপ দেন, তখন সাধারণ একটি গোলও হয়ে ওঠে কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। ফুটবল বিশ্ব তাকে একনামে চেনে ‘ধারাভাষ্যের কবি’ হিসেবে। তিনি পিটার ডোনাল্ড ডুরি, যার কণ্ঠের জাদুকরী স্রোতে শ্রোতার হৃদয়ে উন্মাদনার ঝড় ওঠে, যার শব্দশৈলী সাধারণ একটি ফুটবল ম্যাচকেও মহাকাব্যের নান্দনিকতায় রূপ দেয়। 

​১৯৬৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টির ব্রেনট্রি নামক এক নিভৃত ও শান্ত শহরে জন্ম নেন এই শব্দশিল্পী। তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার দিনগুলো কেটেছিল কেন্ট এবং সারের শান্ত ও সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে। পিটারের পারিবারিক পটভূমি কিন্তু প্রচলিত অর্থে ফুটবলমুখী ছিল না। তার পিতা উইলিয়াম ডুরি ছিলেন চার্চ অব ইংল্যান্ডের একজন একনিষ্ঠ ধর্মযাজক বা ভিকার। চার্চের গম্ভীর আবহ আর প্রতি রবিবারে বেদিতে দাঁড়িয়ে পিতার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠে দেওয়া ধর্মোপদেশ ছোট্ট পিটারের মনের গহীনে এক গভীর দাগ কেটেছিল। মানুষের মনোযোগ কীভাবে আটকে রাখতে হয়, কীভাবে কণ্ঠের ওঠানামার পরিমিতি দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেওয়া যায়-সেই অনবদ্য সুরের প্রথম পাঠটি তিনি তার পিতার ব্যক্তিত্ব থেকেই পেয়েছিলেন। যদিও পিতা ফুটবল পছন্দ করতেন না এবং ক্রিকেট বা রাগবির অনুরাগী ছিলেন, কিন্তু ছোট্ট পিটারের অবচেতন মনে তখন ফুটবলের সুর বাজছিল। 


মাত্র চার বছর বয়সেই তিনি ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে ওঠেন, যদিও পরবর্তীতে বাসস্থান পরিবর্তনের সুবাদে তিনি ওয়াটফোর্ড ক্লাবের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পান। শৈশবে মাঠে গিয়ে সরাসরি খেলা দেখার সুযোগ তার খুব একটা হতো না। ঘরের কোণে বসে রেডিওর নব ঘুরিয়ে ধারাভাষ্য শোনাই ছিল তার ফুটবলীয় রোমাঞ্চের প্রধান মাধ্যম। সে সময় বিবিসি রেডিওর ধারাভাষ্যকার পিটার জোন্স এবং ব্রায়ান বাটলারের গভীর ও কাব্যিক কণ্ঠস্বর পিটারের মনে প্রথম ধারাভাষ্যকার হওয়ার রঙিন স্বপ্নটি বুনে দিয়েছিল। ছোট্ট পিটার নিজেই একা একা ঘরের কোণে ধারাভাষ্য দিতেন, এমনকি মায়ের কাপড় ইস্ত্রি করা কিংবা বাবার সকালের খবরের কাগজ নিয়ে আসার মতো অতি সাধারণ গৃহস্থালি কাজকেও চমৎকার ধারাভাষ্যের রূপ দিয়ে নিজের কথার জাদুকে শাণিত করতেন। 

​পিটারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা সারের লেদারহেডের সেন্ট জনস স্কুলে। সেখানে শাস্ত্রীয় ভাষা ও প্রাচীন সাহিত্য অধ্যয়নের সময় শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসে তিনি রূপক ও অলঙ্কারশাস্ত্রের গভীর প্রয়োগ শেখেন। পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অব হালের রাজনীতি বিভাগ থেকে ১৯৮৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ১৮ বছর বয়সে হালের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৮৫ সালের ৫ নভেম্বর প্রথম সরাসরি মাঠে গিয়ে ফুটবল দেখার রোমাঞ্চ স্পর্শ করেছিলেন পিটার, বুথফেরি পার্কে হাল সিটি আর মিডলসবরোর মধ্যকার ফুল মেম্বারস কাপের সেমিফাইনাল ম্যাচে। স্টেডিয়ামের উন্মাদনা দেখে তিনি শিহরিত হয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন পথটি তার জন্য সহজ ছিল না। স্নাতক শেষ করে কোনো স্থির লক্ষ্য না থাকায় এক প্রকার সামাজিক চাপে পড়ে তিনি হিসাববিজ্ঞানের এক নীরস গলিতে পা বাড়িয়েছিলেন। শিক্ষানবিস হিসাবরক্ষক হিসেবে সেই সংখ্যার যান্ত্রিক দুনিয়ায় পিটারের কাব্যিক মন টিকতে পারেনি। মাত্র এক মাস পরেই তিনি বুঝতে পারেন এই টেবিল-চেয়ারের জীবন তার জন্য নয়। তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে তিনি পাড়ি জমান ক্রীড়া সাংবাদিকতার বন্ধুর পথে। প্রত্যাখ্যানের পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে লন্ডনের বিখ্যাত ‘হেটার্স’ নামক স্পোর্টস নিউজ এজেন্সিতে কাজ শুরু করেন, যা ছিল তার রূপান্তরের প্রথম সোপান। 


​১৯৯০ সালে বিবিসি রেডিও লিডসে ধারাভাষ্যকার হিসেবে পেশাদার অভিষেক ঘটে পিটারের। সেই সময়ে লীডস ইউনাইটেডের ঐতিহাসিক সাফল্য তার ধারাভাষ্যকে সবার নজরে নিয়ে আসে। ১৯৯৪ সালে তিনি যুক্ত হন বিবিসি ফাইভ লাইভের সাথে এবং ১৯৯৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল ও ইউরো ৯৬ কভার করেন। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৮ সালে, যখন তিনি আইটিভি স্পোর্টসে ফুটবল ধারাভাষ্যকার হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের সেই পথচলায় তিনি চারটি বিশ্বকাপ ও চারটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে নিজের কণ্ঠের দ্যুতি ছড়িয়েছেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে বিটি স্পোর্টে যোগদান, প্রিমিয়ার লিগ প্রোডাকশন্সের বিশ্বব্যাপী ফিডের প্রধান হিসেবে কাজ করা এবং ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সিবিএস স্পোর্টসে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের জন্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কণ্ঠ দেওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সোনালী সময়। ২০২২ সালে এনবিসি স্পোর্টসের প্রধান প্রিমিয়ার লিগ ধারাভাষ্যকার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর, ২০২৩ সালে মার্টিন টাইলারের উত্তরসূরি হিসেবে স্কাই স্পোর্টসের প্রধান ধারাভাষ্যকারের আসনে বসেন পিটার ডোরি, যা তার দক্ষতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তার স্ত্রী ভিকি ডোরি এবং তিন সন্তানকে নিয়ে হার্টফোর্ডশায়ারে এক নিভৃত ও সুখী গৃহকোণ গড়ে তুলেছেন। 

​পিটার ডুরির ধারাভাষ্য কেবল ঘটনার বিবরণ নয়, তা এক চলমান শিল্পকর্ম। তার কণ্ঠের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে, যখন অলিম্পিক স্টেডিয়ামে রোমা বার্সেলোনার বিপক্ষে এক অতিপ্রাকৃত প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করেছিল। ৮২তম মিনিটে কোস্তাস মানোলাসের সেই জয়সূচক গোলের পর পিটারের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছিল শব্দশৈলীর অমূল্য অলংকার। তিনি চিৎকার করে উঠেছিলেন যে, রোমা তার নিজের ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছে এবং মানোলাস হলেন রোমের বুকে এক গ্রিক ঈশ্বর। তিনি বলেছিলেন, যা কখনো হওয়ার কথা ছিল না, যা হতে পারত না, আজ তাই ঘটছে। অলিম্পাস পর্বত থেকে নেমে আসা এক গ্রিক আজ রোমের সাত পাহাড়ে এসে এক অসম্ভব অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। পরবর্তীতে পিটার স্বীকার করেছিলেন, গোলটি হওয়ার মুহূর্তে তিনি নিজেও ঠিক বুঝতে পারেননি কে গোলটি করেছেন, আর সেই সময় শুধু ‘রোমা তার ধ্বংসাবশেষ থেকে জেগে উঠেছে’ বলে তিনি কয়েক সেকেন্ড সময় চেয়ে নিয়েছিলেন যাতে পরিচালকের স্ক্রিনে জার্সি নম্বর দেখে গোলদাতার নাম নিশ্চিত হওয়া যায়। সেই সামান্য সময়ের শূন্যতাতেই তার ক্লাসিক্যাল শিক্ষার স্মৃতি থেকে উঠে এসেছিল গ্রিক মিথোলজির এই আশ্চর্য রূপক। 

​তেমনই আরেকটি হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য রচিত হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালে, যেখানে অবশেষে মেসির মাথায় উঠেছিল বিশ্বজয়ের মুকুট। পিটারের কণ্ঠে সেদিন মেসিকে নিয়ে ঝরে পড়েছিল অনন্য এক স্বর্গীয় সুর। তিনি বলেছিলেন, লিওনেল মেসি আজ স্বর্গের সাথে করমর্দন করেছেন এবং রোজারিও থেকে আসা সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ নিজের এক অনন্ত ছায়াপথে আরোহণ করেছেন, যেখানে তিনি একলা নন এবং তার এই মহিমান্বিত ক্ষণে আজ কেবল রাজমুকুট পরার অপেক্ষা। পিটারের এই প্রতিটি কথা যেন ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও ভালোবাসাকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওল্ড ট্রাফোর্ডে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সেই ঐতিহাসিক ঘরে ফেরার দিনেও পিটারের ধারাভাষ্য ছিল এক অনবদ্য কবিতার মতো। তিনি রোনালদোকে নিয়ে বলেছিলেন, মাদেইরা থেকে ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ থেকে তুরিন আর আবারো ম্যানচেস্টার, লাল গালিচায় মোড়ানো ফুটবলের এই মহান চিত্রশালায় পুনরায় আমন্ত্রিত এক হেঁটে চলা জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা নকল বা অনুকরণের ঊর্ধ্বে। পিটারের সেই ধারাভাষ্যের মাঝে ব্যবহৃত অনুপ্রাস এবং ছন্দের অসাধারণ টান শ্রোতাদের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ সৃষ্টি করেছিল। 


​তবে পিটারের নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটি কিন্তু ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী ম্যাচের। যখন স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার সিপিয়োয়ে শাবালালা মেক্সিকোর জালে এক চমৎকার গোল করেছিলেন, তখন পিটারের মুখে বেজে উঠেছিল সমগ্র আফ্রিকার আনন্দধ্বনি-শাবালালা, গোল বাফানা বাফানা, গোল দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য, গোল সমগ্র আফ্রিকার জন্য। বর্ণবাদ আর যুদ্ধের দীর্ঘ ক্ষত পেরিয়ে আসা একটি দেশ যেভাবে সেদিন গ্যালারিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল, সেই পবিত্র মানবিক দৃশ্যকে পিটার তার চিরন্তন সুরের সাথে একাত্ম করে অমর করে তুলেছিলেন। 

​পিটার ডুরি বিশ্বাস করেন, ধারাভাষ্যের মূল সৌন্দর্য হলো সাধারণ সমর্থকদের আবেগের সাথে নিজের আত্মাকে মিশিয়ে দেওয়া। তিনি ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যানের চেয়ে তাদের জীবনের মানবিক গল্পগুলো জানতে বেশি ভালোবাসেন। আধুনিক ফুটবল প্রতিনিয়ত যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, কিন্তু পিটারের ধারাভাষ্যের কাব্যিক ধারা আজও সেই যান্ত্রিকতার মাঝে আবেগের তাজা অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে। তিনি ফুটবল মাঠের এক চিরন্তন কথক, যার কথাগুলো শুধু কানে ভেসে আসে না, বরং শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী এক ছবির মতো আঁকা হয়ে থাকে। যতদিন এই সবুজ গালিচায় ফুটবল খেলা হবে, ততদিন পিটার ডুরির সুরময় কণ্ঠ আমাদের প্রতিটি রোমাঞ্চকর মুহূর্তকে আরও সুন্দর আর জীবন্ত করে রাখবে।

সময়ের আলো/আরবিএন


  বিষয়:   ধারাভাষ্যের কবি  পিটার ডুরি 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: