জাবি ক্যাম্পাসে বাড়ছে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম নিরাপদ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে

2026-07-03T21:49:39+00:00
2026-07-03T21:49:39+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
জাবি ক্যাম্পাসে বাড়ছে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৯ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম নিরাপদ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ছিল ব্যাপক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সেই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা, হলে চুরি, ক্যাম্পাসে মাদকসেবন, ছিনতাই এবং সর্বশেষ নারী ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণ ও শিক্ষার্থীদের ছবি তোলার অভিযোগ— এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে প্রশাসনের নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ধর্ষণচেষ্টা থেকে শুরু নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ
গত ১৩ মে রাত প্রায় ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল ও আল-বেরুনী হলের সম্প্রসারিত এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনাটি পুরো ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করে। প্রথমে তদন্তে র‍্যাব যুক্ত হলেও পরে মামলার তদন্তভার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে ঘটনার ৫১ দিন পার হলেও এখনও অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।


মাদক, চুরি ও গোপন ভিডিও ধারণ— ক্রমেই বাড়ছে অপরাধ
২২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিংপুল এলাকায় গাঁজা সেবনের সময় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষার্থী আলী কারিম ও খন্দকার মেহরুন নেছা সুবাহকে আটক করা হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ৫১ ব্যাচের দুই শিক্ষার্থীর আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রত্যেককে দুই দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন।

এর ঠিক এক মাস পর, ২১ জুন বেগম রোকেয়া হল ও শহিদ ফেলানী খাতুন হলে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের কাপড়, প্রসাধনী ও ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী চুরির সময় এক নারীকে হাতেনাতে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তার কাছ থেকে চুরি হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করে হল প্রশাসন তাকে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করে এবং মামলা দায়ের করে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২৯ জুন গভীর রাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) নারী ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে রিয়াজ আহমেদ নামে এক বহিরাগতকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। ফুটবল ম্যাচ শেষে কয়েকজন ছাত্রী ওয়াশরুমে প্রবেশের সময় তাকে সন্দেহজনকভাবে বের হতে দেখে আটক করা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনে ওয়াশরুমের দরজার ছোট ছিদ্র দিয়ে ধারণ করা প্রায় দেড় শতাধিক স্পর্শকাতর ভিডিও পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এসব ভিডিও ধারণ করা হয়েছে।

এ ঘটনার পরদিনই ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় আরও এক বহিরাগত ধরা পড়েন। পরে তাকেও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নারী শিক্ষার্থীদের ছবি তোলার অভিযোগে আটক যুবদল নেতা
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর ছবি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তোলার অভিযোগে ধামরাই উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ চৌধুরীকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক নেতার আমন্ত্রণে তিনি ক্যাম্পাসে আসেন। এ সময় কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর সন্দেহ হলে তারা তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করতে চান। প্রথমে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, পরে ফোনে কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর ছবি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত গাড়ি তল্লাশি করে দুটি বিয়ারের বোতল উদ্ধার করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখায় নেওয়া হলে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ : বহিরাগতদের দখলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ
শিক্ষার্থীদের দাবি, ছুটির দিনগুলোতে বহিরাগতদের উপস্থিতি এতটাই বেড়ে যায় যে অনেকেই মজা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে 'জাহাঙ্গীরনগর ইকোপার্ক' বলে মন্তব্য করেন। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে সক্রিয় মাদকচক্র, বিশমাইল ও প্রান্তিক গেট এলাকায় ছিনতাই এবং বিভিন্ন সময় হল ও একাডেমিক ভবন থেকে মোবাইল, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল ও সাইকেল চুরির ঘটনায় বহিরাগতদের সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মতে, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে গেটে পরিচয় যাচাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারবিহীন যানবাহনের প্রবেশ সীমিত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানালেও বাস্তবে অনেক বহিরাগত শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও বিভাগ মুখস্থ করে নিরাপত্তাকর্মীদের ফাঁকি দিয়ে প্রবেশ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করেও অনেকে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ছেন। নিরাপত্তাকর্মীরা পরিচয়পত্র যাচাই করতে গেলে কিছু শিক্ষার্থীর অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ ব্যাচের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা জরুরি। আইডি কার্ড স্ক্যানিং, স্বয়ংক্রিয় প্রবেশপথ এবং ছুটির দিনে বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের সদস্যদের দায়িত্বে রাখা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

আরেক শিক্ষার্থী ঐশী বলেন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরের যে সুনাম ছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা ক্ষুণ্ন করছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ. কে. এম. রাশিদুল আলম বলেন, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবাইকে আইডি কার্ড সঙ্গে রাখতে হবে।

আইডি কার্ড স্ক্যানিং ও ডিজিটাল প্রবেশব্যবস্থা চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়নের বিষয়।

বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা
গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনাতেই কোনো না কোনোভাবে বহিরাগতদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। ধর্ষণচেষ্টা, মাদকসেবন, চুরি, গোপনে ভিডিও ধারণ কিংবা নারী শিক্ষার্থীদের ছবি তোলার মতো ঘটনাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ আবাসিক পরিবেশের জন্যও বড় ধরনের হুমকি।

শিক্ষার্থীদের মতে, কেবল ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কঠোর পরিচয় যাচাই, পর্যাপ্ত নজরদারি এবং ক্যাম্পাসজুড়ে কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে দীর্ঘদিনের যে সুনাম, তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   জাবি  ক্যাম্পাস  বহিরাগত  দৌরাত্ম্য  শিক্ষার্থী  উদ্বেগ 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: