গাজার গণহত্যার বিষয়ে আর্জেন্টিনার অবস্থান নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ইসরায়েলের প্রতি একচেটিয়া সমর্থন এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও যুদ্ধবিরতির বৈশ্বিক দাবির বিরোধিতা করে থাকে দেশটি। বিশেষ করে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের পর ইসরায়েলের কট্টর মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেইর পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। অতীতে আর্জেন্টিনার সরকারগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারকেও সমর্থন করে আসছিল। তবে মিলেই প্রশাসনের আমল থেকে সেই অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। গত এপ্রিলে তেল আবিব থেকে আর্জেন্টিনার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেন মিলেই। বিশ্লেষকদের মতে, মিলেইর এই পদক্ষেপ কেবল ইসরায়েলের প্রতি তার আদর্শিক আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন আর্জেন্টিনা। জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার স্বীকৃতির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি গাজায় যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান আর্জেন্টিনা সরকারের। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন উদ্যোগে আর্জেন্টিনা নিজেকে ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র হিসেবে দাবি করে।
আর্জেন্টিনা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হামাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং দেশটির ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন ইউনিটকে হামাসের সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেয়। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা ওই অঞ্চলের আর কোনো দেশ গ্রহণ করেনি।
তবে সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কারণে কারণে নিজ দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন আর্জেন্টিনা প্রেসিডেন্ট মিলেই। আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ বারবার রাস্তায় নেমে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। বুয়েনোস আইরেস দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট মিলেই সম্প্রতি গাজা উপত্যকায় শান্তি রক্ষা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অফ পিস’-এর মাধ্যমে আর্জেন্টিনা গাজায় শান্তি রক্ষায় সহায়তা করতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে তাদের মানবিক সংস্থা ‘হোয়াইট হেলমেট’-এর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিলেইর এই পররাষ্ট্রনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরির অংশ। তবে এই নীতি আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
মোটাদাগে ফিলিস্তিন বা গাজা গণহত্যা ইস্যুতে আর্জেন্টিনার অবস্থান হলো :
১. শত শত নারী-শিশুকে হত্যার পরও গাজায় যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা।
২. জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বারবার ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট।
৩. দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের বিপক্ষে ভোট দেওয়া মাত্র ১০টি দেশের অন্যতম আর্জেন্টিনা।
৪. জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ-প্রাপ্তির তীব্র বিরোধিতা।
৫. স্বাধীনতাকামী হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা।
৬. হামাসের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
৭. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ফি'লি'স্তিনের বিরোধিতা।
৮. প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই কর্তৃক ইসরায়েলকে আর্জেন্টিনার ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র’ ঘোষণা।
৯. ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়া ইসরায়েল অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে ভিসা না দেওয়ায় সেই টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আর্জেন্টিনা।
১০. আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ইসরায়েলকে বেছে নেন। জেরুজালেমের পবিত্র ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল-এ গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
১১. মিলেই ক্যাথলিক হলেও ইহুদিধর্মে দীক্ষিত হওয়ার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করেন।
সূত্র : আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, টাইমস অব ইসরায়েল ও অন্যান্য
সময়ের আলো/আআ