ফিরিবার পথ নাহি, দূর হতে যদি দেখো চাহি, পারিবে না চিনিতে আমায়! হে বন্ধু, বিদায়!
ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে সময়ের কাছে একদিন সবাইকে হার মানতে হয়। কেউ বিদায় নেয় ট্রফি হাতে, কেউ অপূর্ণ স্বপ্ন বুকে নিয়ে। কিন্তু কিছু বিদায় থাকে, যা স্কোরলাইনকে ছাড়িয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তেমনই এক বিদায়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব ফুটবল।
ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপ মঞ্চেও শেষ হলো লুকা মদরিচের অবিস্মরণীয় পথচলা। চারটি বিশ্বকাপ, অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ, অগণিত নিখুঁত পাস আর একটি দেশের স্বপ্নকে কাঁধে তুলে নেওয়ার গল্প। সব মিলিয়ে শেষ হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক মিডফিল্ডারের বিশ্বকাপ অধ্যায়। বয়স, সময় ও বাস্তবতা বলছে, ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতেও সম্ভবত এটিই ছিল তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক তারকার পরিচয় গোল কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। লুকা মদরিচ তাদেরই একজন। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের সূচনা, প্রতিপক্ষের চাপ ভেঙে বেরিয়ে আসা কিংবা কঠিন মুহূর্তে পুরো দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া। এই গুণগুলোই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাই গোলসংখ্যা কখনোই তার অবদান মাপার মানদণ্ড হয়ে ওঠেনি।
মদরিচ ছিলেন না সবচেয়ে দ্রুতগতির ফুটবলার, ছিলেন না সবচেয়ে শক্তিশালীও। তিনি গোলমেশিন ছিলেন না, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে ভালোবাসা কোনো সুপারস্টারও নন। কিন্তু বল যখন তার পায়ে যেত, তখন মনে হতো ফুটবল যেন অন্য এক ছন্দে বাজতে শুরু করেছে। তিনি মাঠে দৌড়াতেন না, যেন পুরো খেলাটাই পরিচালনা করতেন। তার প্রতিটি পাস ছিল দাবাড়ুর পরবর্তী চালের মতো হিসেবি, প্রতিটি স্পর্শ ছিল একজন শিল্পীর তুলির আঁচড়।
কিন্তু এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৮৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার মোদ্রিচি গ্রামে জন্ম নেওয়া লুকার শৈশব কেটেছে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল শরণার্থী হোটেলে। যুদ্ধ তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। ছোট্ট লুকা হোটেলের খোলা জায়গায় বল পায়ে ছুটে বেড়াতেন, আর সেখানেই বুনতেন একদিন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।
সেই শিশুই পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের পরিচয় তৈরি করেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে পৌঁছে যান কিংবদন্তিদের কাতারে। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য এলেও জাতীয় দলের জার্সিতেই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার নাম।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রায় একাই ক্রোয়েশিয়াকে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। শিরোপা না জিতলেও পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল। একই বছর ব্যালন ডি’অর জিতে মেসি-রোনালদোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে নতুন ইতিহাসও গড়েছিলেন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে এনে দিয়েছিলেন তৃতীয় স্থান। তখনই অনেকেই ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন তিনি। কিন্তু দেশের প্রয়োজনেই আবারও ফিরেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৪০ বছর বয়সে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন মদরিচ।
আগের মতো হয়তো পুরো ম্যাচজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে পারেননি, কিন্তু অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও শান্ত উপস্থিতি দিয়ে মাঝমাঠের প্রাণ হয়ে ছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ-৩২-এর ম্যাচে লড়াই করেছে ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের পরাজয়ে শেষ হয়ে যায় তাদের স্বপ্ন। মদরিচের ক্যারিয়ারকে শুধু ট্রফি কিংবা পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ তিনি এমন এক ফুটবলার, যিনি একটি ছোট দেশকে বারবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন। মাঠের বাইরে তার বিনয়, শান্ত স্বভাব ও ব্যক্তিত্বও তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
স্কোর বোর্ড বলবে, ক্রোয়েশিয়া ১-২ পর্তুগাল। ইতিহাস বলবে, একজন কিংবদন্তি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। তোমার পায়ের ছোঁয়ায় ফুটবল আরও সুন্দর হয়েছিল। বিদায় নয়, কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা থেকে যান ইতিহাসের পাতায়, কোটি ফুটবলপ্রেমীর স্মৃতিতে, আর ফুটবলের সৌন্দর্যের চিরন্তন প্রতীক হয়ে।
সময়ের আলো/আরবিএন