আজকের রাতটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এক মহাকাব্যিক থ্রিলার হিসেবে। মায়ামির স্টেডিয়ামে আজ যা ঘটল, তাকে এক কথায় ‘রোলারকোস্টার’ বললেও কম বলা হবে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ২ নম্বর দল আর্জেন্টিনা আর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে আসা ৬৪ নম্বর দল কেপ ভার্দের মধ্যকার নকআউটের এই ম্যাচটি কাগজে-কলমে যতটা একপেশে ভাবা হয়েছিল, মাঠে তার উল্টো চিত্র দেখল বিশ্ব। বুক চিতিয়ে লড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল কেপ ভার্দে, তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর শেষ মুহূর্তের গোলে ৩-২ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটল আর্জেন্টিনা।
আজ মাঠে নেমেই এক অনন্য কীর্তি গড়েন লিওনেল মেসি। এটি বিশ্বকাপে তার ৩০তম ম্যাচ, যা ফুটবল ইতিহাসের যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ। একই সাথে বিশ্বকাপে রেকর্ড ২৭তম বারের মতো শুরুর একাদশে মাঠে নামার রেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দে নিজেদের গুটিয়ে না রেখে ইতিবাচক ফুটবল খেলতে থাকে। তবে রেকর্ডময় ম্যাচে প্রথম আঘাতটি হানেন মেসি নিজেই। ম্যাচের ২৯ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের বাড়ানো চমৎকার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, আগুয়ান গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান এলএমটেন। এটি চলতি বিশ্বকাপে তার সপ্তম এবং সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে ২০তম গোল। এই ১-০ ব্যবধানের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
বিরতির পর ম্যাচের রূপ বদলে যায়। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে মায়ামির গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দেয় কেপ ভার্দে। রায়ান মেন্ডেসের ডান দিক থেকে বাড়ানো বল ধরে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের নজর এড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় বল পান ডেরয় দুয়ার্তে। তাকে ঠেকাতে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ দ্রুত এগিয়ে এলেও, দুয়ার্তে দুর্দান্ত এক শটে মার্টিনেজের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান (১-১)।
সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা আক্রমণের ধার বাড়ালেও কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা আজ চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ৬৩ মিনিটে মেসির দূরপাল্লার শট এবং ৭৩ মিনিটে মেসির নেওয়া ফ্রি-কিক-দুইবারই অবিশ্বাস্য দক্ষতায় দলকে রক্ষা করেন তিনি। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে খেলা ১-১ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই, অর্থাৎ ৯৩ মিনিটে আবার লিড নেয় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে আসা বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এমন ভঙ্গি করলেন যেন দূরের কোণে শট নেবেন, কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে জোরালো বাঁকানো শটে বল নিজের দিকের ওপরের কোণেই পাঠিয়ে দেন। আর্জেন্টিনা শিবিরে তখন স্বস্তির হাওয়া (২-১)।
কিন্তু কেপ ভার্দের রূপকথা তখনও ফুরিয়ে যায়নি। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বাম প্রান্ত থেকে বল পেয়ে ভেতরে কাট-ইন করে ডান পায়ে এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শট নেন সিডনি কাবরাল। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল দূরের পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। ম্যাচ আবার ২-২ সমতায়!
যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি পেনাল্টি শুট-আউটের ভাগ্যপরীক্ষায় গড়াচ্ছে, ঠিক তখনই ১১১ মিনিটে ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। মেসির চমৎকার কর্নার কিক থেকে ডি-বক্সের ভেতর সবার ওপরে লাফিয়ে উঠে এক বুলেট গতির হেড করেন রোমেরো। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুম ও গ্যালারি।
শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের এই রুদ্ধশ্বাস জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের রূপকথার সমাপ্তি ঘটল ঠিকই, তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে তাদের এই বীরত্বগাথা ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনেক দিন দাগ কেটে থাকবে।
সময়ের আলো/আরবিএন