ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় আমগাছগুলো এখন কাঁচাপাকা আমে ভরপুর, থোকায় থোকায় ঝুলছে আম্রপালি। সুস্বাদু ও সুগন্ধি এই আম এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আমের মান চমৎকার হওয়া এবং সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ করায় বিদেশের বাজারে এর দারুণ চাহিদা তৈরি হয়েছে। এতে পীরগঞ্জ উপজেলার আমচাষি ও বাগান মালিকদের মাঝে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে।
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ধান, গম ও ভুট্টার পাশাপাশি বিভিন্ন রকম শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হয়, যা জেলার চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবে এবার পীরগঞ্জের আম্রপালি আম রঙ, রূপ ও স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত থাকায় তা সরাসরি রফতানি হচ্ছে ইউরোপের বাজারে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ অনুসরণের মাধ্যমে এখানে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। এটি আধুনিক কৃষির একটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও লাভজনক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে আম্রপালি আমের প্রদর্শনী প্লট তৈরি করে চাষিদের মাঝে উচ্চ ফলনশীল ও গুণগত মানসম্পন্ন আম চাষের সঠিক কৌশল ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সম্পূর্ণ বিষমুক্ত উপায়ে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি, ফেরোমন ফাঁদ এবং আধুনিক বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করে কীভাবে কম খরচে আমের বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব—তা এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে। ফলে স্থানীয় চাষিদের মাঝে আধুনিক পদ্ধতিতে আম্রপালি ও অন্যান্য উন্নত জাতের বাগান করার ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
উপজেলার সফল আম চাষি শাহিন আলম জানান, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনীর আওতায় প্রথমে তিনি ১ একর জমিতে আম্রপালি বাগান করেন। পরবর্তীতে এর সফলতা দেখে নিজ উদ্যোগে আরও ৭ একর জমিতে বাগান সম্প্রসারণ করেন। কৃষি অফিসের নিয়মিত পরামর্শে বাগান পরিচর্যা করায় এবার আমের ফলন হয়েছে অসাধারণ।
শাহিন আলম বলেন, আমের বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রথমে কিছুটা চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে ‘ডিপ ইন্টারন্যাশনাল’ কোম্পানির মাধ্যমে ইউরোপে ইতোমধ্যে তিন টন আম রফতানি করতে পেরেছি। এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। পুরো বাগানের আম রফতানি করতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হব। আমার এই বাগান দেখে এলাকার অনেকেই এখন আম চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, শাহিনের প্রদর্শনী বাগানের শুরু থেকেই তারা মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাদের নির্দেশনা মেনে চাষ করায় বাগানে এবার পর্যাপ্ত ফলন এসেছে এবং সেই আম বিদেশে রফতানি হওয়াটা পুরো এলাকার জন্য আনন্দের।
রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপ ইন্টারন্যাশনাল’এর প্রতিনিধি সালমান বলেন, আমরা মূলত ঢাকার কারওয়ান বাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে আম রফতানি করে থাকি। শাহীন ভাইয়ের বাগানটি ঘুরে দেখেছি, কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে এখানে সম্পূর্ণ কীটনাশকমুক্ত ও অত্যন্ত মিষ্টি আম উৎপাদিত হয়েছে। বিদেশের মাটিতে এই আমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চাষিরা আমাদের এমন গুণগত মানসম্পন্ন আম সরবরাহ করবেন, এটাই প্রত্যাশা। এখন পর্যন্ত এই বাগান থেকে ৩ টন আম রফতানি করা হয়েছে এবং বাগানটি থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার আম ক্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হাসান বলেন, ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে এই আম্রপালি আমের প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছিল। এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান ও কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। পীরগঞ্জ থেকে ইতোমধ্যে ৩ টন আম বিদেশে গেছে। রফতানির ফলে চাষিরা আমের ভালো দাম পাচ্ছেন।
সময়ের আলো/জোই