জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দুই নারী শিক্ষার্থীর গোপনে ছবি তোলার অভিযোগে আটক দেবাশীষ চৌধুরীর বিরুদ্ধে এবার বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০১৮ সালের একটি শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি ছিলেন এই দেবাশীষ। নতুন করে এই তথ্য সামনে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে, এত গুরুতর অভিযোগের পরও অভিযুক্তকে স্রেফ ‘মুচলেকা’ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ২ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় দুই নারী শিক্ষার্থীর গোপনে ছবি তোলার সময় দেবাশীষ চৌধুরীকে হাতেনাতে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখায় সোপর্দ করা হয়। সেখানে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে লিখিত ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না মর্মে মুচলেকা দেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে ছেড়ে দেয়। আটকের সময় তার ব্যাগ থেকে দুটি বিয়ারের ক্যানও উদ্ধার করা হয়, যা পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।
দেবাশীষকে ছেড়ে দেওয়ার পরপরই প্রকাশ পায় তার বিরুদ্ধে থাকা পূর্বের একটি গুরুতর ফৌজদারি মামলার নথিপত্র। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকার ধামরাই থানায় দায়ের করা ওই মামলায় অভিযোগ ছিল- এক নারী সহযোগীর মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে কৌশলে ডেকে এনে, জোরপূর্বক ইয়াবা সেবন করিয়ে একটি গুদামঘরে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনার প্রধান আসামি ছিলেন এই দেবাশীষ চৌধুরী। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সে সময় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ঘটনার পর মামলার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা গেলেও প্রধান আসামি দেবাশীষ পলাতক ছিলেন।
প্রায় আট বছর পর একই ব্যক্তি ক্যাম্পাসে এসে পুনরায় অপরাধ করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, একজন চিহ্নিত ও পলাতক ধর্ষণ মামলার আসামিকে শুধুমাত্র মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া বড় ধরনের গাফিলতি। তারা এই ঘটনার পুনর্তদন্ত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, প্রক্টর অফিস থেকে এখনো আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো আবেদন আসেনি। আবেদনটি হাতে পেলে আমরা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রম শুরু করব।
অন্যদিকে, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক প্রশাসনের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, আটক করার পর শিক্ষার্থীরাই লিখিত মুচলেকা ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার শর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছিলেন। তাদের সম্মতির ভিত্তিতেই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বিয়ার উদ্ধারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী মাদক মামলায় ব্যবস্থা নিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ আলামত প্রয়োজন হয়, যা এখানে ছিল না। তাছাড়া ক্যানগুলো তার পকেটে নয়, ব্যাগে ছিল এবং তাকে সরাসরি মদ্যপ অবস্থায় পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সালের ধর্ষণ মামলার বিষয়ে সহকারী প্রক্টর জানান, ঘটনার সময় বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। তবে অভিযুক্তের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি পুলিশকে জানানো হবে।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান জানান, ৫ আগস্টের সহিংসতায় থানার রেজিস্টারসহ বিভিন্ন নথিপত্র পুড়ে যাওয়ায় ২০১৮ সালের মামলার মূল নথিটি বর্তমানে থানায় নেই। তবে দেবাশীষ চৌধুরীর নামে ওই ধর্ষণ মামলাটি থাকার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি আরও জানান, মামলাটি অনেক আগেই থানা থেকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাই মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা জানতে আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। স্থানীয় সূত্রেও দেবাশীষের বিরুদ্ধে ওই মামলার সত্যতা মিলেছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/জোই