চীন থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। এক প্রকার বাধ্য হয়েই তারা হুন্ডির মতো অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নেন। যদিও হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি আঘাত করে। তবুও পরিস্থিতিগত কারণে অনেক প্রবাসী অবৈধ পথের দ্বারস্থ হন।
এই প্রতিবেদক চীন সফরের সময় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিশদভাবে কথা বলেছেন। তাদের মারফত জানা গেছে, চীন থেকে সরাসরি বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে সহজে টাকা স্থানান্তরের বৈধ রিটেইল চ্যানেল বা বুথ খুবই সীমিত। সাধারণ কর্মীদের জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও আমলাতান্ত্রিক। রয়েছে ভাষা ও নথিপত্রের জটিলতা।
চীনের স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে লেনদেন করতে হলে নিখুঁত চীনা ভাষা জানা এবং প্রচুর প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র (যেমন : বৈধ কাজের চুক্তি, ট্যাক্স রিটার্ন ইত্যাদি) জমা দিতে হয়। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা প্রবাসীর ক্ষেত্রে এই নথিপত্রগুলো গোছানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার মূল্যের পার্থক্য (এক্সচেঞ্জ রেট)। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডি এজেন্টরা প্রতি ইউয়ানে বা ডলারে বেশি টাকা দেয়। প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য পেতে চান, যা হুন্ডিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
প্রায় দুই যুগ ধরে চীনে ব্যবসায় করছেন পঞ্চগড়ের প্রফেসর ড. মো আলতাব হোসেন। থাকেন সিচুয়ান প্রদেশের চেংদু শহরে। চায়না থেকে গত বছর তিনি সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, সহজভাবে বলতে গেলে ব্যাকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো অনেক খরচ। সাধারণত চায়নার এক আরএমবি (চায়নার মুদ্রা) বাংলাদেশি টাকায় ১৯ টাকা ৫০ পয়সা।
কিন্তু ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে পাঠালে তা হয়ে যায় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ এক হাজার ডলারে প্রায় ১০ হাজার টাকা লস হয়। এটা অনেকের জন্যই বড় ক্ষতি। তাই বাধ্য হয়েই অনেকে হুন্ডিতে টাকা পাঠায়। এটা বিশাল সিন্ডিকেট। উভয় দেশের লোকজনই এখানে জড়িত। তবে আমরা অনেক সময় টাকার ও আরএমবি এক্সচেঞ্জ করে ফেলি। দেশ থেকে টাকা দিয়ে দেয় আমরা চীন থেকে তাকে সমপরিমাণ আরএমপি নিয়ে থাকি।
দেড় যুগ ধরে চায়নায় ব্যবসা করেন ফেনীর সাখাওয়াত হোসেন কাকন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এটা আসলে দুই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা চাইলেই সম্ভব লেনদেন সহজীকরণ করতে পারে। চায়নায় অনেক ধরণের বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আছি। এই ব্যবসার সুবিধার্থে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করতে পারে। যাতে আমরা আরও বেশি রেমিট্যান্স বাংলাদেশে পাঠাতে পারি। এতে ব্যবসাও প্রসারিত হবে, সরকারও লাভবান হবে।
সাত বছর ধরে চীনে আমদানি-রফতানির ব্যবসা করছেন বগুড়ার যুবক এস এম আল আমিন। থাকেন শিজিং প্রদেশে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, দেশে টাকা পাঠাতে গেলে প্রথমে আমাদের মার্কিন ডলার কিনতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ডলারে আমাদের একটা খরচ খরচ যায়। আবার ডলার থেকে চায়নার মুদ্রা আরএমবি কিনতে আবার আলাদা একটা খরচ যায়। তাই টাকা পাঠাতে গেলে আমাদের ডাবল খরচ যায়। চীনে বাংলাদেশি টাকা থেকে আরএমবি করা যায় না।
তিনি মনে করেন, সরকার চাইলে সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার যদি চায়, চীনা সরকারের সঙ্গে যৌথ আর্থিক লেনদেন অর্থাৎ বাংলাদেশি ব্যাংকের একটা শাখা থাকবে; তা হলে লেনদেন সহজতর হবে।
এই ব্যবসায়ী বলেন, চায়না প্রেসিডেন্ট কিন্তু বলেছেন সবকিছুর ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। যদি বাংলাদেশ সরকার এরকম প্রস্তাবনা দেয় আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এটা ভালো হবে। সবার জন্যই সহজ হবে এবং এবং বাংলাদেশে অনেক রেমিট্যান্স যাবে। আর লেনদেন বৈধ হলে মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীও থাকবে না। আমরা শুধু ভাবি যে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের অনেক প্রবাসী আছে। চায়নায় সেই অনুয়ায়ী নেই। কিন্তু এখানে অনেক মেধাবী বাংলাদেশি আছেন।
বছর তিনেক আগে এক বছরের ইন্টার্নশিপ করতে চায়না যান কুমিল্লার রাহাত হোসেন পরশ। হাইনান প্রদেশ দ্য সানিয়া এডিশন হোটেলে ইন্টার্নশিপ শেষ করেন তিনি। সময়ের আলোকে রাহাত হোসেন বলেন, আমি টাকা পাঠাতাম আমার বন্ধুর মাধ্যমে। আমার বন্ধুর সঙ্গে হুন্ডির লোকের পরিচয় আছে। তো তিনি একটা রেট দিয়ে দিত আমাদের। আমরা ওইভাবে টাকা দেশে পাঠাতাম। আর ব্যাংকে টাকা কনভার্ট করে পাঠানো একটু ঝামেলা। কারণ চাইনিজরা ইংরেজি ভাষা বোঝে না। তারপর ডলার করে পাঠালেও অনেক খরচ যায়। আবার ওই ডলার অনেক সময় দেশে আসেও না। টাকাটা ব্যাক আসে আমাদের কাছে।
একই অভিজ্ঞতা গোলজার হোসেন সাগরেরও। চীনে থাকেন দুই যুগ ধরে। তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জে। বেইজিংয়ের ডং চাং এলাকায় রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার আলাউদ্দিন শাআনশি প্রদেশের চাংআন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এই বিষয় নিয়ে আমাদের কমিউনিটির মধ্যে কয়েক দিন আগে আলোচনা হয়েছে। এখানে অনেক হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেন করে। চায়না থেকে টাকাগুলো হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠায় আবার বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা চায়নাতে আনে। এ ক্ষেত্রে এই বিষয়টা অবৈধ। অনেক ছেলে এই টাকা লেনদেন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খায়। অনেকের টাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, টাকা আটকে যায়। যদি ব্যাংকিং কোনো সিস্টেম চ্যানেল থাকে যেটার মাধ্যমে ইজিলি চায়না থেকে বাংলাদেশে লেনদেন করা যায় সেটা দুদিক থেকেই আমাদের জন্য উপকার হয়।
২০২৩ সালে চীনে আসেন যশোরের সাকিব আহমেদ শাহীল। জিয়াংসু প্রদেশে ইয়াংজু ইউনির্ভাসিটিতে ব্যাচেলর ডিগ্রি করছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, চীন থেকে টাকা পাঠানোর বৈধ কোনো চ্যানেল নেই। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো রিস্ক। কিছু করার নেই। বাধ্য হয়েই হুন্ডিতে টাকা পাঠানো হচ্ছে। আর আমি যেহেতু স্টুডেন্ট তাই বাংলাদেশ থেকে টাকা আনতে হয়। প্রতি বছর আমার চার লাখ টাকা প্রয়োজন হয় পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়া বাবদ। এই টাকা আনতেও অনেক খরচ হয়। খরচের বিষয়ে সরকারকে ছাড় দিতে হবে। আর একেক ব্যাংকের ডলারের রেট একেক রকম। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। অনেক সময় টাকা আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে সেটা উত্তোলন করতে লম্বা সময় লাগে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের এটিএম কার্ড চায়নায় লগ-ইন হয় না। টাকা পাঠানো ও আনায় অনেক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চায়না এলামনাইয়ের (অ্যাবকা) সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, চায়না থেকে বাংলাদেশে বা বাংলাদেশ থেকে চায়নায় টাকা পাঠানোর অফিসিয়াল সিস্টেমগুলো সহজতর নয়। ফলশ্রুতিতে অধিকাংশ মানুষ হুন্ডির আশ্রয় নেয়। এই অবৈধ আশ্রয় নেওয়ার ফলে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আসে; টাকা ঠিকমতো পায় না কিংবা রেট কম দেয়।
একই সঙ্গে সরকার বড় ধরনের একটা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা আছে চায়নার সঙ্গে। এই বিষয়টা যদি সহজ করে ব্যাংক টু ব্যাংক করে সহজ করে দেয় তা হলে টাকাগুলো সরকারের কোষাগারে জমা হবে। লেনদেনকারী প্রবাসীরাও নিরাপদ থাকবেন। আশা করছি সরকার সামনের দিকে এই বিষয়গুলো দেখবেন।
লেনদেনের এমন সমস্যা আরও কয়েকটি দেশে আছে উল্লেখ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক সময়ের আলোকে বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ছে। বৈধভাবে ব্যবসায়ীরা কীভাবে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে সে বিষয়ে পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এসএকে