শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত কোমরে রেখে গভীর নিশ্বাস ফেললেন লিওনেল মেসি। ম্যাচ নয় যেন ১২০ মিনিটের স্নায়ুক্ষয়ী যুদ্ধ জয়ের স্বস্তি। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং আফ্রিকার নতুন আবিষ্কার কেপভার্দের ম্যাচটি ছিল এমনই এক যুদ্ধ, যেখানে শেষ হাসি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা হাসলেও প্রশংসার পুরোটাই নিজেদের ঘরে তুলেছে কেপভার্দে।
নকআউটের দ্বিতীয় পর্বে আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তি এত বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে এমনটা হয়তো অনেকের ভাবনায় ছিল না। কিন্তু ম্যাচের আগে-পরে কেপভার্দেকে কেউ সমীহ করেননি, এমনও নয়। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই সমীহ জাগানিয়া পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে গেছেন ভোজিনহা, সিডনি লোপেজরা। ব্যতিক্রম ছিল না আর্জেন্টিনা ম্যাচেও।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই দেখেছে বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে নাটকীয় ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু হারলেও মাথা উঁচু করেই বিশ্বকাপকে বিদায় বলেছে আফ্রিকার ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রটি।
শুরু থেকেই কেপভার্দে ছিল পরিকল্পনায় নিখুঁত। পাঁচ ডিফেন্ডারের জমাট রক্ষণে মাঝমাঠও গাদাগাদি করে রাখায় মেসি, আলমাদা কিংবা ডি পলরা স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেননি। প্রথমার্ধে বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার, কিন্তু পরিষ্কার সুযোগ ছিল খুবই কম। ম্যাচের ২৯মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত পাস ধরে ডি-বক্সে ঢুকে স্বভাবসুলভ নিখুঁত ফিনিশে গোল করেন মেসি।
কিন্তু সেই লিড বেশিক্ষণ টেকেনি। দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল পাল্টে দুই প্রান্ত দিয়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠে কেপভার্দে। আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে তারা সমতায় ফেরে। এরপর শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই কর্নার থেকে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের গোলে আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু কেপভার্দে হাল ছাড়েনি। সিডনি লোপেসের দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে দ্বিতীয়বার সমতায় ফিরে আফ্রিকার দলটি ম্যাচকে টাইব্রেকারের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। তবে ১১১ মিনিটে আরেকটি সেট-পিস থেকেই আসে নিষ্পত্তি। ক্রিস্তিয়ান কুটি রোমেরোর শক্তিশালী হেডে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোলে নিশ্চিত হয় ৩-২ ব্যবধানের জয়।
শেষ কয়েক মিনিট ছিল সবচেয়ে কঠিন। ক্লান্ত আর্জেন্টিনার ওপর একের পর এক আক্রমণ চালায় কেপভার্দে। ১১৬ মিনিটে সিডনি লোপেসের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। তিন মিনিট পর গোলমুখে আরেকটি বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি করেছিল আফ্রিকার দলটি। তবে আর্জেন্টিনার রক্ষণ শেষ পর্যন্ত আর কোনো ভুল করেনি। শেষ বাঁশি বাজার পর স্বস্তির উল্লাসে ফেটে পড়ে স্কালোনির শিষ্যরা।
জয় পেলেও নিজের দলের খেলায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন অধিনায়ক মেসি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম ম্যাচটা কঠিন হবে। স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে ওরা এমনি এমনি অপরাজিত থাকেনি। প্রথম গোলের পর ভেবেছিলাম আমরা আরও স্বস্তিতে খেলব। কিন্তু উল্টো আমরা বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি, রক্ষণাত্মক হয়ে যাই এবং ঠিকভাবে প্রেসিং করতে পারিনি।’
আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আরও বলেন, ‘এই বিশ্বকাপে দলগুলোর মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। এখানে কেউ কাউকে একটুও ছাড় দেবে না। আমরা পরের রাউন্ডে উঠেছি, তবে আমাদের ভুলগুলো অবশ্যই শুধরে নিতে হবে। আজ সেসব ভুল অনেক ছিল।’
এই ম্যাচে গোল করে মেসি গড়েছেন একাধিক রেকর্ড। এবারের বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত সাতটি করে গোল করার কীর্তি গড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০-এ। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের প্রতিটি নকআউট পর্বেই গোল করার বিরল কীর্তিও নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
তবে ম্যাচের অন্যতম নায়ক ছিলেন কেপভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। পুরো ম্যাচে আটটি দুর্দান্ত সেভ করেন তিনি। এর মধ্যে পাঁচবার মেসিকে হতাশ করেন। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে তিনটি নিশ্চিত সুযোগও নষ্ট করেন এই গোলকিপার। আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণের সামনে তিনিই ছিলেন কেপভার্দের সবচেয়ে বড় ভরসা।
ম্যাচ শেষে ভোজিনহার কণ্ঠে ছিল গর্বের সুর। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি কেপভার্দে শুধু অংশ নিতে আসেনি। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটির সঙ্গে সমানতালে লড়েছি। ফলটা হতাশার, কিন্তু এই পারফরম্যান্স নিয়ে আমরা গর্বিত।’
নিজের পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন গোলরক্ষক হিসেবে আমার কাজ ছিল দলকে বাঁচানো। যতবার পেরেছি চেষ্টা করেছি। মেসির মতো খেলোয়াড়কে কয়েকবার থামাতে পারা অবশ্যই বিশেষ অনুভূতি, কিন্তু আমি আরও বেশি খুশি আমাদের পুরো দলের লড়াই নিয়ে।’
ভোজিনহা আরও যোগ করেন, ‘আমরা হয়তো বিদায় নিয়েছি, কিন্তু আশা করি মানুষ এখন থেকে কেপভার্দেকে অন্যভাবে দেখবে। ছোট দেশ মানেই ছোট দল নয়। আমরা সেটাই প্রমাণ করেছি।’ পরিসংখ্যানও কেপভার্দের লড়াইয়ের সাক্ষী। মাত্র ৩৬ শতাংশ বলের দখল রেখেও তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সমানে সমানে লড়েছে। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং ভোজিনহার অনবদ্য গোলকিপিং ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনাকে নাভিশ্বাস তুলেছিল। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলতে নেমেই তারা দেখিয়ে দিয়েছে, সাহস, শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত জয়টা আর্জেন্টিনার। তবে এই ম্যাচ তাদের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তাও। শেষ-১৬-তে সালাহর মিসরের মুখোমুখি হওয়ার আগে স্কালোনির দলকে প্রেসিং, রক্ষণ ও মাঝমাঠের সমন্বয় আরও নিখুঁত করতে হবে। কারণ নকআউটে একটি ছোট ভুলও বিদায়ের কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে বিদায় নিয়েও বিশ্বকাপে নিজেদের পরিচয় নতুন করে লিখে গেল কেপভার্দে। ফলাফলে তারা হেরেছে, কিন্তু ফুটবলের মঞ্চে সম্মান, সাহস আর ভালোবাসা জিতে নিয়েছে। মিয়ামির এই রাত তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয়ের গল্প নয়, বরং এক আন্ডারডগের অবিশ্বাস্য লড়াইয়েরও স্মারক হয়ে থাকবে।
সময়ের আলো/এসএকে