কাপাসিয়ায় মিলল বিরল প্রজাতির তুলা ফুটি কার্পাস

শামীম শিকদার কাপাসিয়া (গাজীপুর)

সারাদেশ

বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় ঢাকাই মসলিনের প্রাণ হিসেবে পরিচিত বিরল প্রজাতির তুলা ‘ফুটি কার্পাস’-এর সন্ধান মিলেছে গাজীপুরের

2026-07-05T02:44:11+00:00
2026-07-05T02:44:11+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার আশা
কাপাসিয়ায় মিলল বিরল প্রজাতির তুলা ফুটি কার্পাস
শামীম শিকদার কাপাসিয়া (গাজীপুর)
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ২:৪৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় ঢাকাই মসলিনের প্রাণ হিসেবে পরিচিত বিরল প্রজাতির তুলা ‘ফুটি কার্পাস’-এর সন্ধান মিলেছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায়। দীর্ঘ গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর আবিষ্কৃত এই ঐতিহাসিক উদ্ভিদ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে কাপাসিয়া উপজেলা প্রশাসন।

ঢাকাই মসলিন একসময় বাংলার অর্থনীতি, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। এর সূক্ষ্মতা, কোমলতা ও অতুলনীয় কারুকার্যের কারণে ইউরোপীয় বণিকরা একে ‘বাতাসে বোনা কাপড়’ নামে অভিহিত করতেন। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, ১২ হাত দীর্ঘ একটি মসলিন শাড়ি অনায়াসেই একটি আংটির ভেতর দিয়ে টেনে নেওয়া যেত। রাজা-বাদশাহ, নবাব ও অভিজাত শ্রেণির পছন্দের পোশাক ছিল এই মসলিন। 

ঐতিহাসিকভাবে সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে মসলিন শিল্পের বিকাশ ঘটলেও এর মূল উপাদান ছিল বিশেষ জাতের তুলা ‘ফুটি কার্পাস’। এই তুলার অত্যন্ত সূক্ষ্ম আঁশ ছাড়া প্রকৃত ঢাকাই মসলিন তৈরি সম্ভব ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শিল্পবিপ্লবের প্রভাব এবং দেশীয় তাঁতশিল্পের অবহেলার কারণে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় মসলিনের স্বর্ণযুগ, হারিয়ে যায় ফুটি কার্পাসের অস্তিত্বও। 

বহু বছর পর হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে গবেষণা শুরু করেন দেশীয় গবেষকরা। সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস তার বিখ্যাত ঝঢ়বপরবং চষধহঃধৎঁস গ্রন্থে ফুটি কার্পাসের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতে গবেষকরা গাছটির গাঠনিক নকশা (গড়ৎঢ়যড়ষড়মরপধষ ঝশবঃপয) তৈরি করেন। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালানো হয়। 

গবেষক অধ্যাপক আবুল করিম তার ‘ঢাকাই মসলিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, তৎকালীন তিতাবাদী (বর্তমান গাজীপুর অঞ্চল), বাজিতপুর, ধামরাই ও সোনারগাঁও এলাকায় উৎকৃষ্ট মানের ফুটি কার্পাস উৎপাদিত হতো। একই তথ্য পাওয়া যায় ইতিহাসবিদ জেমস টেইলরের লেখাতেও। তিনি উল্লেখ করেন, শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ তৎকালীন তিতাবাদী অঞ্চলই ছিল উৎকৃষ্টমানের ফুটি কার্পাসের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। 

এই ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের একপর্যায়ে উপজেলার আমরাইদ মৌজার হাইলজোর এলাকায় বিরল প্রজাতির তুলা গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক ঢাকাই মসলিন কাপড়ের ডিএনএ সিকোয়েন্সের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটিই বহুদিনের কাক্সিক্ষত ফুটি কার্পাস। 

এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় কাপাসিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রায়েদ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে গাছ দুটি সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেশের এই অমূল্য ঐতিহ্য তুলে ধরার লক্ষ্যে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না তাসনীমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। 

কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনীম বলেন, ‘ফুটি কার্পাস শুধু একটি তুলা গাছ নয়, এটি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গৌরবের প্রতীক। এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ দুটি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা, সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের সমন্বয়ে কাপাসিয়াকে মসলিনের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।’ 

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফুটি কার্পাসকে ঘিরে পরিকল্পিত গবেষণা, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটানো গেলে কাপাসিয়ায় একটি সমৃদ্ধ মসলিন পল্লি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। নারায়ণগঞ্জের জামদানি পল্লির আদলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্প ও পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মসলিনের পরিচিতি আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   কাপাসিয়ায় মিলল বিরল প্রজাতির তুলা ফুটি কার্পাস 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: