কুড়িগ্রামের চিলমারী সরকারি ডিগ্রী কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনে কেন্দ্র পরিচালনায় গুরুতর অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্র উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে।
পর্যাপ্ত সংখ্যক কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ না দেওয়ায় অতিরিক্ত উত্তরপত্র বিতরণে বিঘ্ন ঘটে। ফলে, সময় থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিক্ষার্থী ২০ থেকে ১০ নম্বরের উত্তর লিখতে পারেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এক পরীক্ষার্থী উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
গত ২ জুলাই অনুষ্ঠিত এইচএসসি বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় লিখিত অংশে ৭০ এবং বহুনির্বাচনী অংশে ৩০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ওই কেন্দ্রে জেনারেল ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার মোট ৮০০ পরিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের জন্য মোট ১০টি কক্ষে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
কেন্দ্রের কক্ষভিত্তিক উপস্থিতির তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০১ নম্বর কক্ষে ৩২ জন, ১০২ নম্বর কক্ষে ৩২ জন, ১০৩ নম্বর কক্ষে ৩২ জন, ১০৪ নম্বর কক্ষে ৪৪ জন এবং ১০৫ নম্বর কক্ষে ৯ জন ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এ ছাড়া ১০৬ নম্বর কক্ষে ৭১ জন, ১০৭ নম্বর কক্ষে ৫৮ জন, ১০৮ নম্বর কক্ষে ৪৬ জন, ১১০ নম্বর কক্ষে ৪৬ জন ও ১১১ নম্বর কক্ষে ১০৫ জন জেনারেল শাখার পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে একজন কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ বাধ্যতামূলক। সে অনুযায়ী বিএম শাখার কক্ষ পর্যবেক্ষক ঠিক থাকলেও জেনারেল শাখায় পরীক্ষার পরিপত্র মানা হয়নি। পরীক্ষা পর্যবেক্ষক তালিকায় দেখা যায়, জেনারেল শাখার ১০৬ নম্বর কক্ষে ৭১ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ৩জন, ১০৭ নম্বর কক্ষে ৫৮ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ২জন, ১০৮ নম্বর কক্ষে ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ২জন, ১১০ নম্বর কক্ষে ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ২জন ও ১১১ নম্বর কক্ষে ১০৫ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ৪জন কক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কেন্দ্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বোর্ডের এই নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি। ফলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকরা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েন এবং প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উত্তরপত্র সময়মতো সরবরাহ করতে ব্যর্থ হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কক্ষ পরিদর্শক বলেন, ‘পরিপত্র অনুযায়ী পরীক্ষার্থীর বিপরীতে কক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় অধিক পরীক্ষার্থীকে সামাল দেওয়া বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব। অতিরিক্ত শীট বিতরণ, উত্তরপত্রে স্বাক্ষর ও সার্বিক তদারকির কারণে আমরা চরম চাপের মধ্যে ছিলাম।’
আরেক কক্ষ পরিদর্শক বলেন, ‘বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক পরিদর্শক নিয়োগ করা হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। অনেক পরীক্ষার্থী বারবার অতিরিক্ত শীট চাইলেও তা দ্রুত দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
ভুক্তভোগী এক পরীক্ষার্থী বলেন,‘আমার ২০ নম্বরের উত্তর বাকি ছিল। সময় শেষ হওয়ার কারণে নয়, অতিরিক্ত শীট না পাওয়ায় উত্তর লিখতে পারিনি।’
অন্য এক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘অনেক পরীক্ষার্থীকে ২০ থেকে ৩০ নম্বরের উত্তর অসম্পূর্ণ রেখেই বের হতে হয়েছে। পরীক্ষা শেষে অনেকেই কান্না করেছি। এখন ফলাফল নিয়ে চরম শঙ্কায় আছি।’
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, কেন্দ্র পরিচালনায় অবহেলার কারণে তাদের সন্তানরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
জেনারেল শাখার পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মো. নুরুল আমিন বলেন,‘চিলমারী সরকারি ডিগ্রী কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, তাই চাহিদা অনুযায়ী কক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়নি। আগামী পরীক্ষায় কোনো সমস্যা হবে না, দাবি করেন এই আহ্বায়ক।’
তবে, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট (বিএম) কলেজের আবেদনকৃত ১২ জন শিক্ষক কক্ষ পর্যবেক্ষকের তালিকায় থাকলেও অজ্ঞাত কারণে মাত্র ৩ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চিলমারী টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট কলেজের অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান বলেন,‘এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে একটি নম্বরও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরীক্ষার সময় কোনো শিক্ষার্থী অতিরিক্ত উত্তরপত্র (লুজ শীট) চাইলে কক্ষ পরিদর্শকের তাৎক্ষণিকভাবে তা সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন,‘কক্ষ পরিদর্শকদের জন্য বরাদ্দ সম্মানী সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যেই প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিলমারী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব ডা. মজিবল হায়দর চৌধুরী বলেন,‘নীতিমালা থাকলে অনেক সময় কেন্দ্র সু-শৃঙ্খলার স্বার্থে অনেক কিছু করতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষার্থীদের লুজ শীট নেওয়ার নিয়ম কানুন সর্ম্পকে অবগত করেছি। আগামী পরীক্ষায় আশা করছি কোনো ত্রুটি থাকবে না।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা যাবে।’
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন,‘শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্র অনুযায়ী কেন্দ্র পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক। কোনো কেন্দ্রে নির্দেশনা অনুসরণ না করার অভিযোগ পাওয়া গেলে- তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/মহু