কাগজে কলমে গ্রিন সনদ বাস্তবে প্রাণঘাতী

মেজবাহ উদ্দীন খালেদ, সীতাকুণ্ড

সারাদেশ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন

2026-08-19T01:53:25+00:00
2026-08-19T01:53:25+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
জাহাজভাঙা ইয়ার্ড
কাগজে কলমে গ্রিন সনদ বাস্তবে প্রাণঘাতী
মেজবাহ উদ্দীন খালেদ, সীতাকুণ্ড
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১:৫৩ এএম 
জাহাজভাঙা ইয়ার্ড। সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু গত ২৫ বছরের মধ্যে জাহাজভাঙা শিল্পে এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা। এই ট্র্যাজেডি গ্রিন ইয়ার্ডের ভুয়া কমপ্লায়েন্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির কঙ্কালসার চিত্র উন্মোচন করে দিয়েছে।

দুর্ঘটনার নেপথ্য অনুসন্ধান করে জানা যায়, ‘এমটি রাসি’ (পূর্বনাম এইচএস রাস লাফফান) নামের প্রায় ৯৪ হাজার টন ওজনের এই মেগা জাহাজটি ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত হয়। পরবর্তীতে জাহাজটির আন্তর্জাতিক ফ্লাগ ও নাম পরিবর্তন করে ‘ক্যাশ বায়ার’-এর মাধ্যমে বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। 

সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মেটিজফট এশিয়া পিটিই লিমিটেড’ জাহাজটির একটি আইএইচএম (ইনভেন্টরি অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস) তালিকা তৈরি করলেও তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল সব স্থান থেকে তারা নমুনা সংগ্রহ করেনি এবং সরকারি তথ্যকেই চূড়ান্ত ধরে নিয়েছে। পরবর্তীতে এই ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরিবেশ অধিদফতর, বিস্ফোরক অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস, মেরিন একাডেমি এবং শিপ স্ট্রিপ নামের একটি বেসরকারি সেফটি এজেন্সিসহ সরকারি-বেসরকারি মোট ৬টি সংস্থা যাচাই-বাছাইয়ের নামে জাহাজে কোনো ক্ষতিকর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়েই এটিকে নিরাপদ ঘোষণা করে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, একাধিক সংস্থার এই যৌথ পরিদর্শনের প্রক্রিয়াটি ছিল মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। ৫ থেকে ১০ তলা উঁচু একটি বিশালাকার জাহাজের ভেতরে বা কফারড্যাম এলাকায় নেমে সরেজমিনে বিষাক্ত গ্যাস কিংবা বর্জ্য পরীক্ষা না করে পরিদর্শক দলটি কেবল জাহাজের ওপরের ডেক থেকে রিফ্লেক্টর (আয়না) দিয়ে দূর থেকে ট্যাংকগুলো পর্যবেক্ষণ করেছিল। 

এমনকি হাইড্রোজেন সালফাইড ও বিপজ্জনক পদার্থের উপস্থিতি গোপন রেখেই শিল্প মন্ত্রণালয় নিয়োজিত বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড (বিএসআরবি) থেকে জাহাজটি কাটার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। আর কাজ শুরুর আগে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষও গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে স্থানটি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের পাঠায় এই মৃত্যুকূপে।


উপকূলীয় সীতাকুণ্ডের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত জাহাজভাঙা খাত দেশের ইস্পাত ও রি-রোলিং কারখানার মূল কাঁচামাল সরবরাহের একটি বড় মাধ্যম হলেও শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তায় এটি সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে এই শিল্পে অন্তত ১৩৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ৩ জন এবং সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক ৯ জনসহ এই মৃত্যুর মিছিল এখন ১৪৯-এ গিয়ে ঠেকেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশন (এইচকেসি) অনুসমর্থনের পর দেশে ফেরদৌস স্টিলসহ ২৩টি জাহাজভাঙা কারখানা ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ বা কমপ্লায়েন্ট সনদ অর্জন করেছিল। বিশ্বের দরবারে নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের পরিবেশ জাহির করা হলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এইচকেসি সনদ শুধু কাগজের স্বীকৃতি নয়; শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং তাৎক্ষণিক জরুরি উদ্ধার অবকাঠামোর বাস্তব প্রয়োগই এর মূল শর্ত। বিশ্ববাজারে আগামী এক দশকে আরও ১৬ হাজার জাহাজ কাটছাঁটের জন্য আসার কথা থাকলেও গ্রিন সার্টিফিকেটের আড়ালে সীতাকুণ্ডের মতো দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন ও কাগজের সনদের বেড়াজাল পেরিয়ে শ্রমিকের বাস্তব কর্মপরিবেশ নিরাপদ করা না গেলে আধুনিক সবুজ ইয়ার্ডের কোনো অর্থই থাকে না। সীতাকুণ্ডের এই ট্র্যাজেডি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, অসত্য তথ্যের আইএইচএম জমা নেওয়া বন্ধ করা, পরিদর্শন ব্যবস্থার বৈপ্লবিক সংস্কার এবং দুর্ঘটনা ঘটলে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনাই এখন একমাত্র সমাধান। শিল্প বাঁচানোর পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনকে প্রাধান্য দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   কাগজ  কলম  গ্রিন সনদ  প্রাণঘাতী  জাহাজভাঙা ইয়ার্ড 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: