গোলাভরা ধান, অথচ বিক্রির জায়গা নেই। গাইবান্ধার কৃষকের ঘরে এখন এই একটাই দুশ্চিন্তা। সরকার নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার কথা সরকারি গুদামে। কিন্তু তার প্রায় তিন সপ্তাহ আগে গত ৯ আগস্ট থেকেই গাইবান্ধায় ধান সংগ্রহ অভিযান বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্য বিভাগ। ফলে নিজের ফলানো ধান নিয়ে কী করবেন তা নিয়ে দিশাহারা কৃষকরা। বাধ্য হয়ে অনেকেই পানির দরে পাইকারের কাছে ধান বেচে দিচ্ছেন, আবার অনেকে গোলায় ধান জমিয়ে রেখে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন।
জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় বোরো ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিকটন। অথচ গত ১২ আগস্ট পর্যন্তই কেনা হয়ে গেছে ১৪ হাজার ৩৯৬ মেট্রিকটন- লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঢের বেশি। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডুর ব্যাখ্যা, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাড়তি ধান কেনা হয়ে যাওয়াতেই সংগ্রহ অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে গুদামের নিজস্ব হিসাবেই ধরা পড়ছে ভিন্ন চিত্র। জেলার ১১টি খাদ্যগুদামে ধান-চাল মিলিয়ে মোট ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার মেট্রিকটন, বর্তমানে মজুদ আছে ৩৯ হাজার মেট্রিকটন। অর্থাৎ গুদামে এখনও জায়গা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সময়ের আগে ধান কেনা বন্ধের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুলছেন কৃষক ও কৃষক সংগঠনের নেতারা।
সরকার এবার প্রতি মণ ধানের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু খোলাবাজারে মোটা ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৮৫০ টাকায়, চিকন ধান ৯৫০ টাকায়- সরকারি দামের প্রায় অর্ধেক। সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই কম দামেই ধান বেচে দেওয়া ছাড়া কৃষকদের সামনে আর কোনো উপায় থাকছে না।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় বোরো ধানের চাষ হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৯৪ হাজার ১০৮ মেট্রিকটন, বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে তার কাছাকাছি- ৮ লাখ ৯২ হাজার ১৭৩ মেট্রিকটন। নিজেদের খাওয়ার চাহিদা মিটিয়ে জেলায় উদ্বৃত্ত থাকছে মাত্র ৯৭ হাজার ৯২৩ মেট্রিকটন ধান যার একটি বড় অংশ সরকারি গুদামে বিক্রির আশায় ছিলেন কৃষকরা। এখন সেই আশাই দুশ্চিন্তায় বদলে গেছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডু বলেন, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ইতিমধ্যে বাড়তি ধান কেনা হয়ে গেছে, তাই সাময়িকভাবে ধান ক্রয় বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গুদামে জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেন সময়ের আগেই সংগ্রহ বন্ধ করা হলো এবং বাকি সময়ে তা আবার চালু হবে কি না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি।
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি গাইবান্ধা জেলা শাখার সভাপতি সাদেকুল ইসলাম বলেন, জেলার বেশিরভাগ কৃষক পরিবারের বাড়তি আয়ের কোনো উৎস নেই; ধান-চালের ওপরই তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল। অথচ ধানের ন্যায্যমূল্য তারা পাচ্ছেন না। কৃষকের গোলায় এখনও উদ্বৃত্ত ধান মজুদ থাকলেও খাদ্য বিভাগ তা কিনছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন এবং অবিলম্বে ধান সংগ্রহ অব্যাহত রাখার দাবি জানান।
সদর উপজেলার কাটিহারা গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, তাদের পরিবারে চাকরি কিংবা ব্যবসার আয় নেই; ধান-চাল বেচেই সংসার চালাতে হয়, দেনাও শোধ করতে হয়। বাজারে দাম কম, সরকারি গুদামেও বিক্রির সুযোগ নেই- এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার। একই উপজেলার কালীর বাজার এলাকার মঞ্জিল হোসেনও জানান, বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করলে লোকসান অনিবার্য, অথচ সরকারি গুদাম ধান কিনছে না।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ক্রোড়গাছা গ্রামের কৃষক আমজাদ আলী সরকার (৫৫) এবার প্রায় ২০০ মণ বোরো ধান ফলিয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ মণ রেখেছেন নিজেদের খাওয়ার জন্য, বাকি ১২০ মণ বিক্রি করে সংসারের দেনা মেটানোর পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু বাজারের বর্তমান দামে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে বলে জানান তিনি।
গোবিন্দগঞ্জের হাফেজ আলীর অবস্থাও একই রকম- ১২০ মণ উৎপাদনের মধ্যে ৯০ মণ বিক্রির জন্য রেখেও এখন লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে তাকে। সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের কৃষক হায়দার আলী স্থানীয় ভাষায় নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, পাইকাররা কম দাম বলছেন, সরকারি গুদামও ধান নিচ্ছে না- কী করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। সদর উপজেলার মইনুল ইসলাম, মজিবর রহমান, আয়নাল হকসহ অন্তত ২০ জন কৃষক একই ধরনের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার তালিকা তৈরিতেও অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের বাছাই না করেই কৃষক কার্ডের তালিকা ধরে অনেক মহাজন আবেদন করেছেন, আর লটারিতে সেই আবেদনকারীদের নামই প্রকাশিত হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, কার্ড থাকলেও অনেকের ধান আবাদের নিজস্ব জমি নেই। এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে মহাজনরা ২ থেকে ৪ হাজার টাকা দিয়ে স্লিপ কিনে সেই স্লিপেই সরকারি গুদামে ধান দিয়েছেন। ফলে প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকরা এবার সরকারি সুবিধা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে- যা কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আপাতত মাঠ পর্যায়ের ছবিটা এমন- গোলায় ধান জমে আছে, বাজারে দাম নেই, আর সরকারি গুদামের দরজাও বন্ধ। এই ত্রিমুখী সংকটে গাইবান্ধার হাজারো প্রান্তিক কৃষক এখন গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি