সিন্ডিকেটের স্বেচ্ছাচারিতায় চলছে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

সারাদেশ

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমবায় সংস্থা ‘পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’। ‘আলো ঘরে ঘরে, প্রগতি

2026-07-05T18:00:01+00:00
2026-07-05T18:00:01+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সিন্ডিকেটের স্বেচ্ছাচারিতায় চলছে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:০০ পিএম 
ঠাকুরগাও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। ছবি : সময়ের আলো
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমবায় সংস্থা ‘পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’। ‘আলো ঘরে ঘরে, প্রগতি দেশে দেশে’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির কাজ করার কথা থাকলেও ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) বিরুদ্ধে উঠেছে নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ। গ্রাহক পর্যায়ে ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত ও ‘ভূতুড়ে’ বিল আদায়, টেন্ডারে অনিয়ম, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং এবং ঠিকাদার নিয়োগে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে চরম ক্ষুব্ধ স্থানীয় গ্রাহক ও ঠিকাদারেরা।

এই সব অনিয়মের জেরে অতীতে জেলার বিভিন্ন সরকারি দফতরের পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুতের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত কার্যালয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ‘মিনি ঠিকাদার’ তালিকাভুক্তকরণ ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় চরম স্বজনপ্রীতি, গোপনীয়তা এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন চলছে। যোগ্যতাসম্পন্ন স্থানীয় ঠিকাদারদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দিয়ে জেলার বাইরের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে একদিকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে গ্রামীণ জনগণের সেবায় নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠানটি, অন্যদিকে গতি হারাচ্ছে সরকারের ‘আলো ঘরে ঘরে’ বিদ্যুৎ পৌঁছানোর মূল লক্ষ্য।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, তদবির এবং একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর ধরে কর্মরত থেকে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে এই সিন্ডিকেট। দুর্নীতি ও অনিয়মের এই তালিকায় ডিজিএম (কারিগরি) লুৎফুল হাসান সরকার, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম-ইএন্ডসি) নাহিদ ইসলাম এবং সাবেক জিএম আসাদুজ্জামান খানের নাম উঠে এসেছে।

জানা যায়, ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে স্বল্প দৈর্ঘ্য লাইন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন কাজের জন্য গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মিনি ঠিকাদার প্রাথমিক তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নতুন ও প্রতিযোগিতামূলক কোনো প্রতিষ্ঠানকে তালিকায় যুক্ত হতে বাধা সৃষ্টি করেন।

তালিকাভুক্তির জন্য মোট ১৭২টি (মতান্তরে ১৭৬টি) আবেদন জমা পড়ে। তৎকালীন জিএম আসাদুজ্জামান খান প্রথমে ৩১টি এবং পরবর্তীতে আরও ৮টিসহ মোট ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের অধিকাংশই জেলার বাইরের এবং দূরবর্তী এলাকার। এই পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম একটি নির্দেশনা দেন। তিনি জমাকৃত আবেদনগুলোর মধ্যে নথিপত্র সঠিক থাকা ১৭২টি প্রতিষ্ঠানকেই স্বচ্ছতা যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে সম্প্রতি গোপনে কেবল ওই ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

অবৈধ উপায়ে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেওয়ায় ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়—এই দুই জেলার সাধারণ গ্রাহকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের এই স্বেচ্ছাচারিতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দুই জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষ। 

রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, গত ২০২৫ সালের ১৫ মে ১৭৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়লে যাচাই-বাছাই শেষে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সঠিক পাওয়া যায়। তিনি ঠাকুরগাঁও পবিস-এর জেনারেল ম্যানেজারকে ওই ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব রংপুরে প্রেরণের নির্দেশনা দেন। কিন্তু ঠাকুরগাঁও অফিস থেকে মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানো হলে তিনি পুনরায় সব কটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা করেনি। এমনকি অনেক ঠিকাদার সাময়িক তালিকাভুক্তকরণের আবেদন জমা দিতে আসলে তাদের আবেদনপত্র গ্রহণ না করে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরাফাত এন্টারপ্রাইজ নামের স্থানীয় এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ করে আসছি। আমাদের মতো স্থানীয়দের বাদ দিয়ে দূরবর্তী জেলার প্রতিষ্ঠান কীভাবে তালিকায় স্থান পায়, তা বোধগম্য নয়। উল্টো সহকারী জেনারেল ম্যানেজার নাহিদ ইসলাম আমাকে এক বড় বিএনপি নেতার সুপারিশ নিয়ে আসার জন্য বলেন। সুপারিশ আনলে নাকি কিছু করা যেতে পারে!

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম-ইএন্ডসি) নাহিদ ইসলাম বিষয়টি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে খুঁটি গেড়ে বসে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিএম (কারিগরি) লুৎফুল হাসান সরকার বলেন, আমার কাজের পারফরম্যান্স ভালো বলেই হয়তো ওপরের মহল আমাকে বারবার এখানে রেখেছে। তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

সার্বিক বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আশরাফুল আলম খান বলেন, মিনি ঠিকাদার নিয়োগের সার্কুলারটি অতীতের ঘটনা এবং সেটি আগেই ক্লোজ হয়ে গেছে। ১৭২টি আবেদনের বিপরীতে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান এনলিস্টেড হয়েছে। অতীতে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।

তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা বাছাই কমিটির পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে তিনিও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী স্থানীয় ঠিকাদারেরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   সিন্ডিকেট  স্বেচ্ছাচারিতা  ঠাকুরগাঁও  পল্লী বিদ্যুৎ  সমিতি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: