নোয়াগড় ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবন। ছবি : সময়ের আলো
প্রচণ্ড রোদে টিনের ছাউনি যেন আগুনের চুল্লি। মাথার ওপর একটি পাখা ঘুরলেও তাতে গরমের তীব্রতা কমে না। ঘামে ভিজে ক্লাস করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। আবার বর্ষা এলেই শ্রেণিকক্ষে জমে থাকে বৃষ্টির পানি। বিদ্যালয়ের সামনের মাঠ ও চলাচলের পথও পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে সাপ-জোঁকের আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এমন দুর্ভোগের মধ্যেই হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার মানদাময়ী পশ্চিম নোয়াগড় ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৯৫ জন শিক্ষার্থী এবং পাঁচজন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য রয়েছে ২০১৫ সালে নির্মিত চার কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনশেড ভবন। এর ১টি কক্ষ দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ৩টি কক্ষে দুই শিফটে পাঠদান চলছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। টিনের ছাউনি ও ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
ছাদের রড পলেস্তারা ধসে পড়ছে, নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
মানদাময়ী পশ্চিম নোয়াগড় ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুবীর কান্তি গোপ জানান, গ্রীষ্মকালে রোদের তাপ বাড়লেই টিনের ছাউনি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় গরম হয়ে ওঠে। একটি পাখা চললেও তাতে গরমের তীব্রতা কমে না। ফলে শিক্ষার্থীদের পোশাক ঘামে ভিজে যায় এবং পাঠে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে টিনের চালের ফুটো দিয়ে শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি পড়ে এবং মেঝেতে পানি জমে থাকায় ভেজা পরিবেশেই পাঠদান চালাতে হয়।
বিদ্যালয়ে ইঁদুরের উৎপাতও রয়েছে। ইঁদুর প্রায়ই বৈদ্যুতিক তার কেটে ফেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া, বন্যার সময় বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের সাপ ও জোঁকের আতঙ্ক নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়।
এদিকে, শুধু মানদাময়ী পশ্চিম নোয়াগড় ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নয়, উপজেলার বদলপুর ইউনিয়নের দীঘলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পূর্ব পিঠুয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সম্প্রতি দিঘলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আতঙ্কে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দেন। পরে উপজেলা শিক্ষা অফিসের হস্তক্ষেপে সরকারি অনুদান হিসেবে চার বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ১২ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। ওই অনুদানের মাধ্যমে অস্থায়ী টিনশেড ঘর নির্মাণ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূর্ব পিঠুয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মর্তুজ আলী জানান, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ভবনের ছাদের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির কক্ষ দুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে।
ভীম থেকে পলেস্তারা ধসে পড়ছে, ১২ নম্বর পূর্ব পিঠুয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে আসছি। কিন্তু এখনও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণিকক্ষের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এতে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়। দ্রুত ভবনটি সংস্কার অথবা নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা না হলে যেকোনও সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
পূর্ব পিঠুয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপ্লব দেবনাথ জানান, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৫২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে এসেছে। ছাদের একাধিক স্থানে ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে একমাত্র মানদাময়ী পশ্চিম নোয়াগড় ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় টিনশেড ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। অতীতে বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ এসেছিল বলে তিনি শুনেছেন। তবে কী কারণে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে তার জানা নেই।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়টির নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিও (ডেমি-অফিসিয়াল) লেটার পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া, ১২ নম্বর পূর্ব পিঠুয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে। নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্যও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
অভিভাবকরা বলেন, কোমলমতি শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তাদের দাবি, উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পাঠগ্রহণ করতে পারে।