বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৯০ নম্বর পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ৫ বছর ধরে পলিথিন টাঙানো এক জরাজীর্ণ ছাপড়া ঘরে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রতিনিয়ত ক্লাস করায় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।
জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়টির পুরনো ভবনটি ২০২১ সালে নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও সেখানে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ফলে জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা গোলপাতার এক ছাপড়া ঘরেই দুই শিফটে ৩টি শ্রেণির পাঠদান করানো হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষে কোনো বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় প্রচণ্ড রোদে ঘরের ভেতর টেকা দায় হয়ে পড়ে। আবার বৃষ্টি হলে গোলপাতার ছাউনির ওপর দেওয়া পলিথিন চুইয়ে পানি পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে তখন ক্লাস বন্ধ করে দিতে হয়। অনেক সময় শিক্ষকদের ছোট অফিস কক্ষে গাদাগাদি করে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এমন চরম দুর্ভোগের কারণে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই স্কুল থেকে সরিয়ে অন্য বিদ্যালয় ও মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি তীব্র শিক্ষক সংকটও দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়ে মোট ৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন শিক্ষক। ২০২৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজিনা আক্তার। এছাড়া ২০২৫-২০২৬ সেশনের শুরু থেকে সহকারী শিক্ষকের আরও ২টি পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে মাত্র ৩ জন শিক্ষক নিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্লাস পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মমিনুল ইসলাম, জেরিন আক্তার, তাছরিন জারিন আবৃতা ও সুরাইয়া আক্তার আক্ষেপ করে বলে, রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কষ্ট করে আমাদের ক্লাস করতে হয়। কবে আমাদের একটা নতুন স্কুল ভবন হবে কেউ বলতে পারে না।
অভিভাবক তহমিনা বেগম ও শারমিন বেগম বলেন, ৭-৮ কিলোমিটার দূর থেকে হেঁটে ছেলে-মেয়েদের এই স্কুলে নিয়ে আসি। পড়াশোনার মান ভালো হলেও ৫ বছর ধরে শিক্ষকরা এভাবে পলিথিন টাঙানো ঘরে কষ্ট করে ক্লাস নিচ্ছেন। আমরা দ্রুত এখানে একটি নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, প্রতিদিন আমাদের অভিভাবকদের হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৩ সালে ক্ষুদ্র মেরামতের সরকারি বরাদ্দ থেকে একটি ছোট টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, যা এখন অফিস রুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বৃষ্টির সময় ছেলে-মেয়েদের এই অফিস রুমেই এনে বসাতে হয়। নতুন ভবনের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রধান শিক্ষক শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ভবন না থাকায় প্রতিনিয়ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিস্থিতি দেখে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন। একটি নতুন ভবন হলেই কেবল এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে ভবন না থাকার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে অবহিত করেছি। একাধিকবার বরাদ্দের চাহিদাপত্র ও তালিকায় স্কুলটির নাম পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী বরাদ্দ এলেই এই স্কুলে নতুন ভবন নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে আশা করছি।
সময়ের আলো/জোই