গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনে খাবারে জালিয়াতি ধরলেন এমপি
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৭:০৪ পিএম
হাসপাতাল পরিদর্শনকোলে সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের খাবারে সরকারি বরাদ্দের তুলনায় মাংসের পরিমাণ কতটা কম দেওয়া হচ্ছে, তা নিজ হাতে ওজন করে দেখলেন গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে আকস্মিক পরিদর্শনে হাসপাতালের রান্নাঘরে ঢুকে ব্রয়লার মুরগির মাংস ওজন করে দেখেন তিনি। সরকারি নিয়মে প্রতিটি রোগীকে দুপুরের খাবারে ১৯০ গ্রাম মাংস দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৪০ গ্রাম। ওজন করা ছয় টুকরো মাংসের মধ্যে একটির ওজন পাওয়া যায় ৪০ গ্রাম, বাকি পাঁচটির ওজন ২৫ থেকে ৩৫ গ্রামের মধ্যে।
শুধু মাংসেই নয়, রুটি, কলা, ডাল ও সবজিসহ রোগীদের প্রায় সব পথ্যেই একইরকম অনিয়ম চোখে পড়ে বলে জানান সংসদ সদস্য।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে রোগীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে না।’
পরিদর্শনকালে তিনি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে রোগীদের দৈনিক খাবারের রুটিন একাধিকবার চাইলেও, তা দেখাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শহিদুল্লাহকে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের সঠিক ওজন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন সংসদ সদস্য।
মাংস ওজন করা হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আজ রাত থেকেই নির্ধারিত রুটিন ও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী রোগীদের খাবার সরবরাহ করতে হবে।’
ডা. শহিদুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালে ২৫০ রোগীর জন্য খাবারের বরাদ্দ থাকলেও চাপ বেশি থাকায় প্রতিদিন প্রায় চারশ রোগীকে খাবার সরবরাহ করতে হয়।
তবে, আড়াইশ রোগীর খাবার চারশ রোগীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হলেও ১৯০ গ্রামের বদলে কেন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম মাংস দেওয়া হচ্ছে, এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি তিনি। শুধু আশ্বাস দেন, আজ রাত থেকেই খাবারের সঠিক ওজন নিশ্চিত করা হবে।
হাসপাতাল চত্বর পরিদর্শনেও অনিয়মের চিত্র দেখতে পান সংসদ সদস্য। দুপুর সাড়ে বারোটা পার হয়ে গেলেও হাসপাতাল চত্বর থেকে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ করা হয়নি দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে পৌর কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনকালে বেশ কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজন সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ করেন, রাতের বেলা চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। এমনকি একজন চিকিৎসকের মোবাইল ফোন চুরি হলেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে সিসি ক্যামেরা থাকলেও, তা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া, হাসপাতালে সম্প্রতি কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে বলেও সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ আসে।
অভিযোগে বলা হয়, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তার প্রতিনিধির মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শনকালে আব্দুল করিম দেখতে পান, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মীই কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
হাসপাতাল চত্বর পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য।
দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করে একের পর এক অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেন এই সংসদ সদস্য।
এসময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালের নবনির্মিত ৯ তলা ভবনটি এখনও সচল করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি ইতোপূর্বে একাধিকবার জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন। ভবিষ্যতেও এই বিষয়টি সংসদে পুনরায় উত্থাপন করার আশ্বাস দেন তিনি।
পরিদর্শন শেষে সংসদ সদস্য, সংশ্লিষ্টদের রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং হাসপাতালে যাবতীয় অনিয়মের কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ- এই ছয় উপজেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই জেলা সদর হাসপাতাল।