কেন থামছে না অবৈধ ট্রলিং? সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে হুমকিতে রুপালি ইলিশ

কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদান ও প্রশাসনিক আশ্বাসের পরও বঙ্গোপসাগরে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ট্রলিং।

2026-07-05T19:03:59+00:00
2026-07-05T19:03:59+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কেন থামছে না অবৈধ ট্রলিং? সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে হুমকিতে রুপালি ইলিশ
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৭:০৩ পিএম 
অবৈধ ট্রলিং। সময়ের আলোর ফাইল ছবি
বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদান ও প্রশাসনিক আশ্বাসের পরও বঙ্গোপসাগরে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ট্রলিং। বরং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী উপকূল সংলগ্ন সাগর এলাকায় দিন দিন বেড়েই চলেছে রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য। এর ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় অর্থনীতি এবং হুমকির মুখে পড়ছে দেশের সম্ভাবনাময় নীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি)।

সরকার ঘোষিত ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় সাগরে পাড়ি জমিয়েছিলেন হাজারো জেলে। কিন্তু লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে জ্বালানি, বরফ ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েও অধিকাংশ ট্রলার ফিরেছে শূন্য হাতে বা আশানুরূপ মাছ ছাড়াই। জেলেদের দাবি, +নিষেধাজ্ঞার সুফল তারা পাচ্ছেন না; কারণ উপকূলীয় এলাকায় অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগেই মাছের ঝাঁক নিঃশেষ করে ফেলছে।

মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ঋণ করে সমুদ্রে যাই, কিন্তু মাছ পাই না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক প্রকাশ্যে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন চাইলে খুব দ্রুত এ কার্যক্রম বন্ধ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।


উপকূলীয় জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাধারণ মাছধরা কাঠের ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উইঞ্চ মেশিন ব্যবহার করে মাছের অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও অনেক ট্রলিং বোট উপকূলের কাছাকাছি কম গভীরতার পানিতে মাছ আহরণ করছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ ট্রলিংয়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ‘বটম ট্রলিং’। এ পদ্ধতিতে ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে টেনে নেওয়া হয়, ফলে সামুদ্রিক ঘাস, প্রবাল, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ফাঁসের জালে ধরা পড়ছে ইলিশের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু ও কাঁকড়ার বাচ্চা, যা ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদনের জন্য মারাত্মক হুমকি।

জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ রেণু ও পোনা নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাগরে আর কোনো মাছ অবশিষ্ট থাকবে না।

এছাড়াও ক্ষুদ্র নৌকার জেলেদের অভিযোগ, বিশাল আকারের ট্রলিং বোটগুলো প্রায়ই তাদের পাতা জালের ওপর দিয়ে চলাচল করে। এতে জাল ছিঁড়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হলেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না; বরং প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি-ধমকির মুখে পড়তে হয়।

স্থানীয় আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও যে পরিমাণ মাছ মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আসত, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, লইট্টা, চিংড়িসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ কমে বাজারে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জেলে পরিবারগুলোর আয় হ্রাস পাচ্ছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং অনেকে বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র দূষণ ও উপকূলীয় পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি এই অবৈধ ট্রলিং বর্তমানে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইন, বিধিনিষেধ, নজরদারি ব্যবস্থা এবং একাধিক সরকারি সংস্থা থাকার পরও বছরের পর বছর অবৈধ ট্রলিং বন্ধ না হওয়ায় উপকূলবাসীর মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র প্রশাসনিক দুর্বলতা ও তদারকির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ট্রলিং বোটসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আমরা নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছি। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় আমাদের কিছু লজিস্টিক বা নৌযানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, অবৈধ ট্রলিং প্রতিরোধে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

উপকূলীয় অঞ্চলের সচেতন মহলের মতে, অবৈধ ট্রলিং এখন শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, এটি দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর সরাসরি আঘাত। তাই কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, প্রয়োজন নিয়মিত সমন্বিত অভিযান, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ট্রলিং সিন্ডিকেটের নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। অন্যথায় রুপালি ইলিশের জন্য বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অচিরেই মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   অবৈধ ট্রলিং  সিন্ডিকেট  দৌরাত্ম্যে  হুমকি  রুপালি ইলিশ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: