বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রতিটি প্রজন্মেরই একজন নায়ক থাকে। এমন একজন, যাকে দেখার জন্য দর্শক টিকেট কাটে, টেলিভিশনের সামনে বসে, কিংবা শেষ বাঁশি পর্যন্ত নিশ্বাস আটকে রাখে। কখনো তিনি পায়ের জাদুতে মোহ ছড়ান, কখনো অবিশ্বাস্য গতিতে সময়কে হার মানান। এই সময়ের বিশ্বকাপে সেই নামটি কিলিয়ান এমবাপে। তার দৌড় যেন বাতাসেরও আগে, তার গোল যেন বজ্রপাতের মতো আকস্মিক। মনে হয়, তিনি মাঠে নামেন শুধু জয়ের জন্য নন; ইতিহাসকে আরেকবার নতুন করে লেখার জন্য।
কিন্তু ইতিহাস কখনো একা লেখা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি মহাকাব্যেরই থাকে একজন সমান শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। এমবাপের গল্পে সেই নামটি লিওনেল মেসি। চার বছর আগে কাতারের আকাশের নিচে যে দ্বৈরথ শুরু হয়েছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে তার নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে।
এবারও গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের কেন্দ্রে মেসি ও এমবাপে। শেষ ষোলোর ম্যাচে কেপভার্দের বিপক্ষে গোল করে মেসি সাত গোল নিয়ে কিছু সময়ের জন্য এগিয়ে যান। কিন্তু ইতিহাস যেন অপেক্ষা করছিল আরেকটি উত্তরের জন্য। কয়েক ঘণ্টা পরই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করে এমবাপেও সাত গোলে পৌঁছে আবার একই সরলরেখায় দাঁড় করান দুই মহাতারকাকে।
এখন বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ শুধু একটি দলের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, দুই কিংবদন্তির সমান্তরাল অভিযাত্রাও। ৭ জুলাই মিসরের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মেসির সামনে সুযোগ থাকবে এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার। আবার ফ্রান্সের পরবর্তী ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে এমবাপেও চাইবেন সেই ব্যবধান মুহূর্তেই মুছে দিতে। গোল্ডেন বুটের এই প্রতিযোগিতা তাই এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপকাহিনি। সংখ্যা কখনো কখনো গল্পের চেয়েও শক্তিশালী ভাষা হয়ে ওঠে।
দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত সাতটি করে গোল। এমন কীর্তি এর আগে কেউ গড়তে পারেননি। প্রথমবারের মতো সেই ইতিহাস লিখেছেন মেসি ও এমবাপে। আর সর্বকালের বিশ্বকাপ গোলদাতার তালিকাতেও ব্যবধান এখন মাত্র এক গোল। ২০ গোল নিয়ে শীর্ষে মেসি, ঠিক তার পেছনেই ১৯ গোল নিয়ে এমবাপে। যেন একজন বর্তমানের কিংবদন্তি, আরেকজন ভবিষ্যতের ইতিহাস। দুজন পাশাপাশি হাঁটছেন একই পথে।
এমবাপের বিশ্বকাপ-গল্প শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। কিশোর বয়সে বিশ্বকে বিস্মিত করে ফ্রান্সকে শিরোপা এনে দেওয়া সেই তরুণকে তখন অনেকেই ভবিষ্যতের তারকা বলেছিলেন। সময় প্রমাণ করেছে, তিনি শুধু ভবিষ্যৎ নন। তিনি বর্তমানেরও সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে তার হ্যাটট্রিক ফুটবলের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। শিরোপা না জিতেও তিনি সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বড় মঞ্চে আলো নিভে গেলে শেষ আলোটি অনেক সময় একজন খেলোয়াড়ের নামেই জ্বলে থাকে।
২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তরুণ আরও পরিণত। এখন তিনি শুধু গতির প্রতীক নন, নেতৃত্বেরও প্রতীক। ফ্রান্সের আক্রমণের প্রতিটি ছন্দ যেন তার পা থেকে শুরু হয়। প্রতিপক্ষ জানে, এক মুহূর্তের ভুলই যথেষ্ট। কারণ এমবাপ্পে সময় নেন না, সময় কেড়ে নেন। তার খেলার সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত গতি নয়, সিদ্ধান্ত। কখন দৌড়াতে হবে, কখন পাস দিতে হবে, কখন শট নিতে হবে। সবকিছু যেন তিনি অন্যদের চেয়ে কয়েক সেকেন্ড আগেই বুঝে ফেলেন। তাই তাকে আটকানোর পরিকল্পনা কাগজে যত সহজ, মাঠে ততটাই অসম্ভব।
বিশ্বফুটবল দীর্ঘদিন মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আলোয় আলোকিত ছিল। এখন সেই আকাশে নতুন সূর্যের মতো উদিত হয়েছেন এমবাপে। তবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন, যার নামের পাশে লেখা আছে অসংখ্য অসম্ভবের গল্প- লিওনেল মেসি। হয়তো শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বুট উঠবে মেসির হাতে। হয়তো এমবাপেই হবেন নতুন রাজা। হয়তো বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার নামও বদলে যাবে। কিন্তু ফল যাই হোক, এই দ্বৈরথ বিশ্বকাপের ইতিহাসে থেকে যাবে এক অনন্য কাব্য হিসেবে।
কারণ কিছু লড়াই ট্রফির জন্য হয়, কিছু লড়াই রেকর্ডের জন্য। আর কিছু লড়াই হয় সময়কে জয় করার জন্য। মেসি ও এমবাপের এই গল্প ঠিক তেমনই। যেখানে প্রতিটি গোল কেবল জালের ঠিকানা খুঁজে পায় না, পৌঁছে যায় ফুটবলের অনন্ত ইতিহাসেও।
সময়ের আলো/এসএকে