বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠছে ফাইনালের মতো। আর সেই মঞ্চে যখন মুখোমুখি হয় ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী পর্তুগাল ও স্পেন, তখন উত্তেজনা পৌঁছে যায় ভিন্ন মাত্রায়। একদিকে ৪১ বছর বয়সেও রেকর্ড ভাঙতে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল। অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্য, পাল্টা আক্রমণ বিপরীতে বল দখলের লড়াই, দুই ভিন্ন দর্শনের এই লড়াইয়ে জয়ী দলই নিশ্চিত করবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট।
এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালের যাত্রা ছিল নাটকীয়তায় ভরা। চার ম্যাচে অপরাজিত থাকলেও প্রতিটি ম্যাচে আধিপত্য দেখাতে পারেনি রবার্তো মার্টিনেজের দল। গ্রুপ পর্বে ডি আর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে সমালোচনায় পড়েছিল তারা।
তবে শেষ ৩২ পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয় পর্তুগাল। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে গনসালো রামোসের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় তারা। যদিও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল ভিএআর ও কানেক্টেড বল প্রযুক্তির সহায়তায় বাতিল হওয়ায় ম্যাচটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। পুরো ম্যাচে চারটি গোল বাতিল হওয়াও ছিল বিরল ঘটনা।
অন্যদিকে শুরু থেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারানোর পাশাপাশি কেপভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তারা। এরপর শেষ ৩২ পর্বে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেয় লা রোহা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সালের ইতালি, ২০১০ সালের স্পেন এবং ২০১৪ সালের জার্মানি, এই তিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নই শিরোপা জয়ের পর আর কোনো বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি। এবার সেই অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান ভাঙতে মরিয়া স্প্যানিশরা।
স্পেনের আক্রমণে সবচেয়ে আলোচিত নাম লামিনে ইয়ামাল হলেও বড় ম্যাচে ধারাবাহিকভাবে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছেন মিকেল ওয়ারজাবাল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করা এই ফরোয়ার্ড এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের ৮ গোলের মধ্যে ৫টিতেই সরাসরি অবদান রেখেছেন। করেছেন চার গোল, সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শুরুর একাদশে খেলা সর্বশেষ ১৬ ম্যাচে তার অবদান ২৪টি গোলে।
অন্যদিকে ইয়ামালকে খুব হিসাব করেই ব্যবহার করছেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। কেপভার্দের বিপক্ষে ১৯ মিনিট, সৌদি আরবের বিপক্ষে ৪৫ মিনিট খেলে গোল, উরুগুয়ের বিপক্ষে ৭৬ মিনিট এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৮৫ মিনিট মাঠে ছিলেন। নকআউট পর্বে তার ওপর আস্থা আরও বেড়েছে, সেটাই স্পষ্ট।
পর্তুগাল শিবিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় আক্রমণভাগ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করা গনসালো রামোস শুরুর একাদশে সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে রোনালদোও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছেন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন, উজবেকিস্তানের বিপক্ষেও ছিলেন কার্যকর। তাই অভিজ্ঞ এই মহাতারকাকেই শুরু থেকে মাঠে দেখার সম্ভাবনাই বেশি।
মাঝমাঠের লড়াইও হতে যাচ্ছে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের অন্যতম বড় উপাদান। স্পেনের রদ্রি, পেদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজ বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারদর্শী। অন্যদিকে জোয়াও নেভেস, ভিতিনিয়া ও ব্রুনো ফার্নান্দেজের নেতৃত্বে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা রয়েছে পর্তুগালের। যে দল মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করবে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটাই তাদের হাতে থাকবে। পরিসংখ্যানও দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চলতি বছরে পর্তুগালের আট ম্যাচের ছয়টিতেই প্রথমার্ধ শেষ হয়েছে সমতায়। অন্যদিকে স্পেন সর্বশেষ ১০টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের ৯টিতেই ক্লিন শিট রেখেছে।
পর্তুগাল শিবিরে চোট কিংবা নিষেধাজ্ঞার খবর নেই। স্পেনের ক্ষেত্রে নিকো উইলিয়ামস ও ইয়েরেমি পিনো আগের ম্যাচে চোটের কারণে খেলতে পারেননি, তবে তাদের খেলা এখনও নিশ্চিত নয়।
দুই দলের শক্তির পার্থক্য খুবই সামান্য। ২০২৫ সালের জুনে উয়েফা নেশনস লিগে তাদের ম্যাচ ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালে স্পেন ১-০ ব্যবধানে জিতলেও, একই বছরে আরেকটি ম্যাচ শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। সর্বশেষ পাঁচ দেখায় কোনো দলই স্পষ্ট আধিপত্য দেখাতে পারেনি।
সময়ের আলো/এসএকে