একসময় মরক্কোর নাম উচ্চারিত হতো ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে। বড় কোনো দলকে হারালে সেটিকে বলা হতো অঘটন, আর শেষ চারে ওঠাকে রূপকথা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন মরক্কোকে নিয়ে বিস্ময়ের বদলে দেখানো হচ্ছে শ্রদ্ধা, সমীহ জাগানিয়া এক দলে পরিণত হয়েছে আফ্রিকান প্রতিনিধিরা। বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা আর অতিথি নয়, শিরোপার অন্যতম দাবিদার।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছিল আটলাস লায়ন্সরা। অনেকে ভেবেছিলেন, সেটি হয়তো একবারের জন্য ঘটে যাওয়া এক অসাধারণ গল্প। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে মরক্কো জানিয়ে দিয়েছে- তারা এখন ধারাবাহিক শক্তি।
এই বিশ্বকাপে তাদের পথচলা ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে শুরু। এরপর স্কটল্যান্ডকে ১-০ এবং হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করে। শেষ ৩২-এ টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করার পর শেষ ষোলোয় কানাডার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ৩-০-তে ম্যাচ জিতে নিশ্চিত করে শেষ আটের টিকেট।
কানাডার বিপক্ষে প্রথমার্ধে খুব একটা স্বচ্ছন্দে ছিল না মরক্কো। বিরতির পর যেন পাল্টে যায় পুরো চিত্র। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে একের পর এক আক্রমণে ভেঙে দেয় কানাডার রক্ষণ। সেই ম্যাচ শেষে কোচ মোহামেদ ওয়াহবি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেছেন তার খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার। ওয়াহবির ভাষায়, ‘খেলোয়াড়রা অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে। কঠিন সময়েও তারা ধৈর্য হারায়নি এবং দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছে।’
হারের পরও মরক্কোর সামর্থ্যরে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেননি কানাডার কোচ জেসি মার্শ। যদিও নিজের দল নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি বরং এই দলকেই বেছে নেব।’ তার মতে, ৩-০ স্কোরলাইন যতটা একপেশে মনে হচ্ছে, ম্যাচটি বাস্তবে ততটা ছিল না। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগানোর দিক থেকে মরক্কো ছিল অনেক বেশি কার্যকর।
বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি জলাতান ইব্রাহিমোভিচও ম্যাচ বিশ্লেষণে মরক্কোর প্রশংসা করেছেন। তার মতে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মরক্কোই ছিল বেশি পরিণত ও সংগঠিত দল। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত রূপান্তর এবং কার্যকর আক্রমণের কারণেই তাদের জয় পুরোপুরি প্রাপ্য। আসলে এই মরক্কো আগের সেই মরক্কো নয়। ২০২২ সালে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল দুর্ভেদ্য রক্ষণ। স্পেন কিংবা পর্তুগালের মতো দলও সেই রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। কিন্তু এখন সেই শক্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে আক্রমণের নতুন ধার। বলের নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীল পাসিং এবং দ্রুত আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার ক্ষমতা তাদের আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মরক্কোর মাঝমাঠ। ব্রাহিম দিয়াজের সৃজনশীলতা যেমন আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তেমনি তরুণ আইয়ু বুয়াদ্দি নিজের পরিশ্রম, বল নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত পাসিং দিয়ে মাঝমাঠকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছেন। তাদের সঙ্গে আজ্জেদিন ওনাহির ছন্দময় পারফরম্যান্স মরক্কোর মাঝমাঠকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ইউনিটে পরিণত করেছে। কানাডার বিপক্ষে ওনাহির জোড়া গোল সেই আধিপত্যেরই প্রতিচ্ছবি।
ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমি যেন এই দলের স্পন্দন। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণে উঠে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে অস্থিরতা তৈরি করাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আধুনিক ফুটবলে একজন ফুলব্যাকের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করা হয়, হাকিমি যেন তারই আদর্শ উদাহরণ। তবে মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একক তারকা নন, বরং দলগত ঐক্য।
একজনের ভুল আরেকজন ঢেকে দেন, একজনের পরিশ্রম অন্যজনকে অনুপ্রাণিত করে। এই উত্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পরিকল্পনা। আধুনিক ফুটবল একাডেমি, উন্নত প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং ইউরোপে বেড়ে ওঠা মরক্কান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল আজ সাফল্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই অর্জন কোনো আকস্মিক বিস্ময় নয়, বরং বহু বছরের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ফসল।
এবার সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সেবার ২-০ গোলে জিতে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স, আর হৃদয় জিতে নিয়েছিল মরক্কো। চার বছর পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউটে দেখা হচ্ছে তাদের, তবে এবার মঞ্চ কোয়ার্টার ফাইনাল। ২০২২ সালে মরক্কো ছিল বিস্ময়ের নাম, আর আজ তারা বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি।
রূপকথার দিন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন মরক্কো নিজেদের গল্প নিজেরাই লেখে। চার বছর আগে যে দরজার সামনে থেমে যেতে হয়েছিল, এবার সেই দরজাতেই আবার কড়া নাড়ছে আটলাস লায়ন্স। ওপারে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স। আর এপারে কোটি আফ্রিকান সমর্থকের স্বপ্ন। শেষ বাঁশি যা-ই বলুক, মরক্কো ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে তাদের উত্থান ক্ষণিকের নয়। আর যদি ফরাসি দুর্গও ভেঙে পড়ে, তা হলে বিশ্বকাপের মানচিত্রে আফ্রিকার স্বপ্নের রাজধানীর নাম হবে মরক্কো।
সময়ের আলো/এসএকে