ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, পরিচয় এবং সংস্কৃতির অংশ। আর সেই আবেগের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীকগুলোর একটি হলো ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল। বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘সেলেসাও’ নামে। ব্রাজিল এমন একটি দল, যার সমর্থন শুধু নিজ দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের অগণিত ভক্ত।
ফিফা বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে সেই দৃশ্য নতুন করে প্রমাণিত হয়। লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চল অসংখ্য মানুষ ব্রাজিলের প্রতিটি ম্যাচকে নিজেদের দেশের ম্যাচের মতো করেই উদযাপন করেন।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, লেবানন, জ্যামাইকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্বকাপ এলেই এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই দেখা যায় ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সি, উড়তে থাকে সবুজ-হলুদ পতাকা। রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ কিংবা বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন সবখানেই হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হন শুধু একটি দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে। ভাষা, জাতীয়তা কিংবা সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও ব্রাজিলের প্রতি এই ভালোবাসা যেন সবাইকে এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও এই দৃশ্য বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। কাতারে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি শ্রমিক নিজেদের দেশের জার্সি নয়, বরং গর্বের সঙ্গে গায়ে তুলেছিলেন ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। তাদের উচ্ছ্বাস, উদযাপন এবং সমর্থনের অসংখ্য ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরেও সেই একই চিত্র আবারও দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে স্পষ্ট বোঝা যায় ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে কমেনি, বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এই ভালোবাসার সবচেয়ে অনন্য উদাহরণগুলোর একটি বাংলাদেশ। যে দেশ এখনও পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়নি এবং বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৮১তম স্থানে রয়েছে। বিশ্বকাপে নিজেদের দলকে দেখতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা যেন সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন ব্রাজিলকে হৃদয়ে ধারণ করে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলটিকে তারা নিজেদের জাতীয় দলের মতোই ভালোবাসেন, তাদের জয়ে আনন্দিত হন, পরাজয়ে কষ্ট পান।
বর্তমানে ব্রাজিলে বসবাসরত বাংলাদেশি আলোকচিত্রী ও ক্রীড়া সাংবাদিক শানুর রুমেন মনে করেন, এই সম্পর্ক কোনো সাময়িক উন্মাদনা নয়; বরং এটি বহু প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন।
ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিলের ভালোবাসার সম্পর্ক আজকের নয়, বহু পুরোনো। পেলে, রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, নেইমারের মতো কিংবদন্তি ফুটবলাররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলাদেশিদের হৃদয় জয় করেছেন। ব্রাজিল মানেই সুন্দর ফুটবল, শিল্পের মতো ফুটবল। এই ভালোবাসা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উত্তরাধিকার হিসেবে পৌঁছে যায়।’
শানুর রুমেনের নিজের জীবনও এই ভালোবাসার এক জীবন্ত উদাহরণ। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রতি গভীর টানই তাকে একসময় দক্ষিণ আমেরিকায় নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তিনি শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবেই কাজ করছেন না, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে এক আবেগের সেতুবন্ধ তৈরি করার চেষ্টাও করে চলেছেন।
তার ভাষায়, ‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি সবসময় স্বপ্ন দেখেছি ব্রাজিলের মানুষকে দেখাতে, বাংলাদেশিরা কতটা আন্তরিকভাবে সেলেসাওকে ভালোবাসে। আমি সেই গল্পগুলো তুলে ধরতে চাই, যাতে ফুটবলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ব্রাজিল আরও কাছাকাছি আসে। ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও ফুটবলের প্রতি একই ভালোবাসা আমাদের একসূত্রে বেঁধেছে।’
অবশ্য শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের আরও অনেক দেশেই ব্রাজিলের প্রতি এই আবেগের পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস। যেমন লেবাননে ব্রাজিলের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ দুই দেশের দীর্ঘদিনের অভিবাসন-সম্পর্ক। বহু লেবানিজ পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্রাজিলে বসবাস করছে। ফলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে গভীর সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক, যা ফুটবলের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করেছে। ব্রাজিল ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি। কারণ একের পর এক বিশ্বমানের ফুটবলার পেলে থেকে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকা, নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা নতুন প্রজন্মের আরও অনেক তারকা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেই চলেছেন।
সময়ের সঙ্গে ফুটবল বদলেছে, বদলেছে কৌশল, বদলেছে খেলোয়াড়। কিন্তু ব্রাজিলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আজও একই রকম অটুট। কারণ ব্রাজিল শুধু একটি জাতীয় ফুটবল দলের নাম নয়; এটি সুন্দর ফুটবলের প্রতীক, অসংখ্য স্মৃতির নাম, কোটি কোটি মানুষের শৈশবের আবেগ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ের এক চিরন্তন ভালোবাসার নাম।
সময়ের আলো/এসএকে