রাজধানীতে হানিট্র্যাপের ফাঁদে ফেলে এক ব্যক্তিকে ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ, ব্ল্যাকমেইল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্য এবং সম্ভাব্য আরও ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
রোববার (৫ জুলাই) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তরিকুল ইসলাম।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বদিউজ্জামান শাহিন, মরিয়ম, শাহাদাত হোসেন ও পূর্ণ বেগম।
সংবাদ সম্মেলনে তরিকুল ইসলাম জানান, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণকারী কর্মকর্তা গত ১৫ এপ্রিল ঋণসংক্রান্ত কাজে রাজধানীর রামপুরার দক্ষিণ বনশ্রীর একটি মার্কেটে গেলে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই নারী ঋণ নিতে আগ্রহী বলে পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করেন। পরে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
একপর্যায়ে ওই নারী বনশ্রীর ইউনিটি হাসপাতালের সামনে দেখা করার প্রস্তাব দেন। নির্ধারিত দিনে সেখানে পৌঁছালে আরেক নারী তাকে রিকশাযোগে খিলগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। ফ্ল্যাটে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই আরও চারজন সেখানে উপস্থিত হয়ে ভুক্তভোগীকে মারধর করেন। এরপর তাকে বিবস্ত্র করে ওই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, ভিডিও ধারণের পর ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, নগদ টাকা, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে তার কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। একই সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাব এবং বিকাশ ও উপায় অ্যাপের মাধ্যমে মোট এক লাখের বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পাশাপাশি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, পরে ভুক্তভোগী গত ২২ জুন খিলগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি ২ জুলাই ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগে হস্তান্তর করা হলে প্রাথমিক তদন্ত শেষে ৩ জুলাই দিবাগত রাতে রাজধানীর সবুজবাগ, বাড্ডা ও খিলগাঁও এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালিয়ে চক্রটির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে নয়টি মোবাইল ফোন, একটি ওয়াকিটকি এবং চার হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চক্রটি একই কৌশলে একাধিক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে নির্যাতন করেছে এবং তাদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছে। এসব আলামতের ভিত্তিতে আরও সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং চক্রটির অন্যান্য সদস্যকে শনাক্তে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও জানান, গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তারা কীভাবে অপরাধ পরিচালনা করত এবং আরও কতজন এদের শিকার হয়েছেন সেসব তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তরিকুল ইসলাম বলেন, অপরিচিত ব্যক্তি বা নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে নির্জন ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সামাজিক লজ্জা বা আত্মসম্মানের ভয়ে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক কারণে অভিযোগ করতে চান না। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়ে একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/আরবিএন