সরকারি খাদ্য মজুদে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামে মোট খাদ্য মজুদ পৌঁছেছে ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ মেট্রিকটন, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। চলতি জুলাই মাস শেষে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি আরও বাড়বে বলে খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে সর্বোচ্চ খাদ্য মজুদ ছিল ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে। সে সময় সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে চলতি বোরো মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। আগামী মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত বোরো সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। এই সময় পর্যন্ত মজুদ পরিস্থিতি আরও বেড়ে যাবে। তবে সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে মোট খাদ্যপণ্যের ধারণক্ষমতা সাড়ে ২২ লাখ মেট্রিকটন।
তাই একসঙ্গে এর বেশি মজুদ করার সক্ষমতা নেই। থাকলে এই মৌসুমে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ২৫ থেকে ২৬ লাখ মেট্রিকটন ছাড়িয়ে যেত। তবে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার রেশনের জন্য খাদ্যশস্য বিতরণ এবং ওএমএসের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যশস্য বিক্রি করায় মোট মজুদ থেকে কমে আসবে।
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুদ বেড়েই চলেছে। গত ৫ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোটিং (ভাসমান) মজুদসহ দেশে খাদ্যশস্যের মোট সরকারি মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ মেট্রিকটন। খাদ্য অধিদফতরের দৈনন্দিন খাদ্যশস্য পরিস্থিতিসংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী সরকারি গুদামগুলোতে বর্তমানে প্রধান খাদ্যশস্য চালের মজুদ রয়েছে ১৭ লাখ ৯১ হাজার ১৯৭ মেট্রিকটন। এ ছাড়া গমের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৮৩ মেট্রিকটন এবং ধানের মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩২৭ মেট্রিকটন। এর ফলে ফ্লোটিং বা ভাসমান মজুদ বাদে মোট মজুদের পরিমাণ ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩ মেট্রিকটন। এর সঙ্গে চালের ৪ হাজার ৭৭২ মেট্রিকটনের ফ্লোটিং মজুদ যুক্ত হয়ে সর্বমোট মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫২ হাজার ৮১৫ মেট্রিকটনে।
ধানের এই পরিমাণ চালের আকারে রূপান্তর করেই মোট মজুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে দেশব্যাপী বোরো সংগ্রহ অভিযান পুরোদমে চলছে। এই মৌসুমে মোট ১৮ লাখ বোরো ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ জুলাই পর্যন্ত মোট বোরো সংগ্রহ হয়েছে ১০ লাখ ৯২ হাজার ২১৯ মেট্রিকটন।
এদিকে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে মোট ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪০৫ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল আমদানি হয়েছে ৭৫ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ টন এবং গম আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭ টন।
আমদানির খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি ব্যবস্থাপনায় (জিটুজি ও আন্তর্জাতিক টেন্ডার) মোট ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৮ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০ টন চাল এবং ৭ লাখ ৩৫ হাজার ১৮ টন গম রয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মোট ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৩ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে; যার মধ্যে সিংহভাগই চাল (৬৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৬ টন) এবং গম ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৭ টন। চলতি অর্থবছরে খাদ্য সাহায্য হিসেবে কোনো চাল বা গম আমদানি করা হয়নি।
খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানের এই মজুদের পরিমাণ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ এবং আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকায় বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদফতরের সংগ্রহ বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের এই মজুদ সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন খাদ্য মজুদ থাকলে তা নিরাপদ মজুদ হিসেবে গণ্য হয়। সে হিসেবে এখন দেশে যা মজুদ আছে তা খুবই নিরাপদ। সরকার যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। খাদ্য মজুদ এখন খুবই সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে নতুন ধান ও চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আগামী দিনগুলোতে এই মজুদের পরিমাণ আরও বাড়বে। গত ৩ মে থেকে খাদ্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময় ৫ লাখ মেট্রিকটন ধান, ১২ লাখ মেট্রিকটন চাল, ১ লাখ মেট্রিকটন আতপ চাল, ৫০ হাজার মেট্রিকটন গমসহ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
এর আগে সর্বোচ্চ মজুদ ছিল গত বছরের আগস্টে। খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এর আগে দেশে সর্বোচ্চ খাদ্য মজুদ ছিল ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে। সে সময় দেশে ২২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন খাদ্য মজুদ ছিল, যা ওই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সে সময়ের খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতেও বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে খাদ্য মজুদ ছিল। সে সময় সরকারি গুদামগুলোতে প্রায় ২০ লাখ ২৭ হাজার ৪২০ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। তখন ১৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭৮৭ মেট্রিকটন চাল, ২ লাখ ৩৩ হাজার ২২৪ মেট্রিকটন গম এবং ৯৭ হাজার ৪০৯ মেট্রিকটন ধান সরকারি সংগ্রহে ছিল। এর আগে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৮ লাখ ৮১ হাজার টন মজুদ ছিল। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ১৮ লাখ ২ হাজার টন, ২০২১ সালে ৭ লাখ ২৬ হাজার টন, ২০২৪ সালে ১৫ লাখ ৫২ হাজার টন এবং ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৮৮ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল।
মজুদ বাড়ার ৪টি প্রধান কারণ :
খাদ্যশস্য রেকর্ড পরিমাণ মজুদের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে চলতি মৌসুমে সময়মতো পর্যাপ্ত বোরো সংগ্রহ। চলতি মৌসুমে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিকটন। এখন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে সাড়ে ১১ লাখ টনের মতো। এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ জোরদার হওয়ায় গুদামে চাল-ধানের মজুদ বেড়েছে।
মজুদ বৃদ্ধির আরেক কারণ হচ্ছে খাদ্যশস্য আমদানিও বেড়েছে। সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার ৫১ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৫ লাখ টন চাল ও ৪ লাখ টন গম আমদানির পরিকল্পনা করছে। তাই আমদানি ভালো হওয়ায় মজুদ বেড়েছে।
মজুদ বৃদ্ধির আরেক কারণ বিতরণ তুলনামূলক কম হওয়া। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মাসে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বিতরণ কম হওয়ায় মজুদ বেড়েছে। বাজার দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার এখনই বড় আকারে ওএমএস-টিসিবিতে ছাড়ছে না।
এ ছাড়া বাজার মনিটরিং ও কর ছাড়ের প্রভাবও রয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, চিনিসহ ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎস কর ও আগাম কর প্রত্যাহার করায় আমদানি খরচ কমেছে, ফলে আমদানিতে আগ্রহী হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজার থেকে কিনে মজুদ করাও সহজ হয়েছে। অর্থাৎ বেশি ধান-চাল সংগ্রহ, বেশি আমদানি এবং কম বিতরণ- মূলত এসব কারণে সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্য মজুদে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি মজুদ ভালো থাকায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, যদি সরকারের মজুদ ঠিক থাকে, তা হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ সরকারের হাতে বেশি ধান-চাল থাকলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করার সুযোগ পায় না।
তবে চালের মজুদ পর্যাপ্ত থাকার পরও সম্প্রতি চালের দাম বেড়েছে। এর কারণ সরকারের ওএমএস কার্যক্রম তেমন একটা চলছে না। এর সুযোগ কিছুটা নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এর জন্য বাজারে তদারকি বাড়ানো দরকার। সরকারি তদারকি এখন নেই বললেই চলে।
সরকারি তদারকি বাড়ালে চালের বাজারসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজারেও দাম ক্রেতার নাগালে থাকবে। কারণ বাজারে এখন তেমন কোনো পণ্যেরই সংকট নেই। তা ছাড়া সরকার নতুন বাজেটে ৬০ পণ্যের যে শুল্ক কমিয়েছে তার সুফল এখনও ক্রেতারা পাননি। অর্থাৎ যেসব পণ্যের শুল্ক কমানো হয়েছে সেগুলোর দাম এখনও সেভাবে কমেনি। সরকারি তদারকি সংস্থাগুলোর এখানেও কাজ করার দরকার আছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি