দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম সংগ্রহ, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর রূপরেখাও তুলে ধরেছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি তথ্য জানান। এছাড়া তিনি অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার পরিকল্পনা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে তিন বছর ও পরবর্তী সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর আওতায় নতুন ট্যাংক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযান যুক্ত করে স্থলযুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে আধুনিক আর্টিলারি রকেট ব্যবস্থা, ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের মাধ্যমে দূরপাল্লায় নির্ভুল আঘাত এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে।
লিখিত জবাবে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীতে আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি), কাউন্টার ইউএভি এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি অনুধাবনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বিমানযোগে অভিযান পরিচালনা, আকাশপথে সৈন্য ও সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং নদীপথে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বাহিনীর কৌশলগত ও অপারেশনাল গতিশীলতা আরও সুসংহত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে আর্টিলারি গোলাবারুদ, এমএলআরএস রকেট, ট্যাংকের গোলাবারুদ, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে ফিউজ ও প্রাইমার, আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের দেশীয় উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। এতে বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।
নৌবাহিনী প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সমুদ্রে নজরদারি জোরদারে বর্তমানে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও আকাশযান সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল এবং সাবমেরিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মনুষ্যবিহীন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করা, নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ, বিদ্যমান ঘাঁটির উন্নয়ন, দেশীয় জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌসদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ মহড়া বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’-এর আওতায় বিমান বাহিনীতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, ইউএভি সিস্টেম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, প্যাসিভ ডিটেকশন সিস্টেম, মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম এবং লং রেঞ্জ রাডার ও এয়ার ট্রাফিক সার্ভেইলেন্স রাডার সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে বৃহত্তর বগুড়ায় একটি ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে পৃথক ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজেড) স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সশস্ত্র বাহিনীর উৎপাদন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির কাজও চলমান রয়েছে। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, ক্ষুদ্র অস্ত্রের উপকরণ, সামরিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, যোগাযোগ সরঞ্জাম, পোশাক, সুরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন সামরিক উপকরণ উৎপাদন ও সংযোজন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিকস এবং উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এক্ষেত্রে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়নের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি
সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিএনপি সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে মেয়েদের শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সরকার ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিল। বর্তমান সরকার তা অনার্স পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে চায়। তিনি আরও জানান, ভালো ফল করা ছাত্রীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস ও স্কুলব্যাগ সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ‘বহুমাত্রিক’ চ্যালেঞ্জ
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয়। এর সমাধান অনেকাংশে নির্ভর করছে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার সরকারের অবস্থানের ওপর। তিনি জানান, সরকার দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় চলছে এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় বাংলাদেশ নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শেয়ারবাজার কারসাজিকারীদের বিচারের আশ্বাস
খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে সংঘটিত শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে দুদক তদন্ত শুরু করেছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএসইসি কারসাজির দায়ে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। বাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ তদন্ত কমিশন, সংস্কার কমিশন, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল গঠনের মতো সংস্কার কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে
গুজব প্রতিরোধে ‘বাংলাফ্যাক্ট’ কাজ করছে : তথ্যমন্ত্রী
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গুজব, অপতথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা মোকাবিলায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘বাংলাফ্যাক্ট’ অপতথ্য ও গুজব প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বুধবার সংসদে ফাহিমা নাসরিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত ‘বাংলাফ্যাক্ট’ ৮৬০টি ফ্যাক্টচেক, বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ভিডিও ও রিল প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকাশিত হয়েছে ৩০৬টি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচটি দাবির সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত ১৩৭টি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ, সংবাদমাধ্যমের আদলে পরিচালিত ১৬টি অপতথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট, ৩০০টির বেশি বিভ্রান্তিকর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং ১০০টি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য শিগগিরই একটি ‘ফ্যাক্টচেক ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করা হবে। ভবিষ্যতেও এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সময়ের আলো/জেডআই