পছন্দের ইউএনও পেতে এমপিদের তদবির

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। বিভিন্ন সংসদীয় আসনে নিজেদের পছন্দের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)

2026-07-09T00:11:19+00:00
2026-07-09T00:11:19+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
পছন্দের ইউএনও পেতে এমপিদের তদবির
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:১১ এএম 
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো। ছবি : সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। বিভিন্ন সংসদীয় আসনে নিজেদের পছন্দের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছেন সংসদ সদস্যরা (এমপি)। কোথাও মৌখিক, কোথাও আবার আধা সরকারি (ডিও) চিঠির মাধ্যমে সুপারিশ করছেন। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যাড প্র্যাকটিসের কারণে প্রশাসন দাঁড়াতে পারছে না। নিরপেক্ষ প্রশাসনের জন্য মাঠ পর্যায়সহ সব জায়গায় পদায়নে রাজনৈতিক তদবির শূন্য করতে হবে। উপযুক্ত লোককে উপযুক্ত জায়গায় পোস্টিং দিতে হবে।

মাঠ প্রশাসনে বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে প্রধানত ৩৫, ৩৬ ও ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, রূপগঞ্জ উপজেলায় এখনও ৩৪তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা ইউএনও হিসেবে কর্মরত আছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উপজেলায় নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাকে ইউএনও হিসেবে পদায়নের জন্য স্থানীয় এমপির তদবির বেড়েছে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় স্থানীয় এমপি কামরুজ্জামান রতন তার পছন্দের এক কর্মকর্তাকে ইউএনও হিসেবে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একইভাবে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় স্থানীয় এমপি আবদুস সালাম আজাদ এবং টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার স্থানীয় এমপি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাকে ইউএনও হিসেবে পদায়নের জন্য তদবির করেছেন। তদবিরের এ প্রবণতা শুধু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির এমপিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপিরাও ইউএনও বদলি ও পদায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের এনসিপির একজন এমপি তার নির্বাচনি এলাকার ইউএনও বদলির জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কাছে সুপারিশ করেছেন বলে জানা গেছে। একই তালিকায় রয়েছেন শাহজাহান চৌধুরী, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা এবং চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য।

শুধু সাধারণ আসনের এমপিরাই নন, সংরক্ষিত নারী আসনের কয়েকজন এমপিও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও, ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা মো. উমর ফারুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিপুণ রায় চৌধুরী।

এদিকে প্রশাসনের আসন্ন রদবদলে মাঠ প্রশাসন থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে ইউএনও হিসেবে পদায়নের অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যেও পছন্দের পদায়ন নিয়ে তৎপরতা বেড়েছে। ইউএনও ‘ফিট লিস্টে’ থাকা অনেক কর্মকর্তা নিজেদের পছন্দের উপজেলায় পদায়নের আশায় স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বর্তমানে শুধু ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অধীনেই ইউএনও পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন ৩৩ জন কর্মকর্তা।


এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকবে? নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা বদলিতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব কি ভোটের গ্রহণযোগ্যতার ওপর পড়বে? 

প্রশাসন ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। ফলে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিভিন্ন জেলায় এমপিদের পক্ষ থেকে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে। কোথাও মৌখিকভাবে, কোথাও লিখিত ডিও লেটারের মাধ্যমে সুপারিশের তথ্যও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, সুপারিশ থাকলেই যে তা বাস্তবায়ন হবে এমন নয়। তবে নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের তদবিরের আলোচনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কাজ এগোচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য হালনাগাদ, বিধিমালা সংস্কার এবং নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

দেশে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, প্রায় ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৩৩০টি পৌরসভা। এত বিশাল নির্বাচনি আয়োজন পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের সময় ইউএনও, জেলা প্রশাসক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকার ওপর নির্ভর করে ভোটের পরিবেশ।

প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকার যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়, তা হলে মাঠ প্রশাসনও নিরপেক্ষ থাকবে। নির্বাচনকালে আমরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করি। কোনো জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত সুপারিশ গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ ও ১২৬ অনুচ্ছেদ এবং আরপিওর প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ কার্যকর করতে সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষ বাধ্য। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে কমিশনের নির্দেশই প্রধান বিবেচ্য।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর বলেন, নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের বড় দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এ ধরনের রাজনৈতিক তদবিরকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।

তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসনসহ সব পর্যায়ের পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবির সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন। যোগ্য কর্মকর্তাকে যোগ্য স্থানে পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতিও জনআস্থা বাড়বে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   ইউএনও  এমপি  তদবির  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: