বিশ্বকাপ হোক কিংবা ইউরোপের শীর্ষ লিগ, ম্যাচ চলাকালে একটি দৃশ্য প্রায়ই সবার চোখে পড়ে। হাইড্রেশন ব্রেক বা খেলা থামার ফাঁকে মেসি, রোনালদো কিংবা এমবাপ্পের মতো তারকা ফুটবলাররা বোতল থেকে পানি বা তরল মুখে নেন, কিন্তু সেটি গিলে না ফেলে কয়েক সেকেন্ড পর মাঠেই ফেলে দেন। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তীব্র দৌড়ঝাঁপ ও তৃষ্ণার পরও কেন ফুটবলাররা পানি গিলে খান না?
এর পেছনে কোনো কুসংস্কার বা অভ্যাস কাজ করে না; বরং রয়েছে আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানের একটি বিশেষ কৌশল, যার নাম ‘কার্বোহাইড্রেট রিন্সিং’। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে হওয়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমাতে এবং খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে দারুণ সহায়তা করে।
দীর্ঘ সময়ের উচ্চগতির খেলায় অনেক ফুটবলার সাধারণ পানির বদলে কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ বিশেষ পানীয় মুখে নেন, যাতে সাধারণত ‘মল্টোডেক্সট্রিন’ নামের এক ধরনের সহজপাচ্য শর্করা থাকে। এই তরল ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড মুখে রাখলেই মুখের ভেতরের বিশেষ স্নায়ুগুলো সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে শরীরে নতুন শক্তির জোগান আসছে।
ফলে মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে ক্লান্তির অনুভূতি কমিয়ে দেয় এবং পেশিকে আরও কিছু সময় উচ্চগতিতে কাজ করার নির্দেশ দেয়। সহজ কথায়, শরীরে সরাসরি শক্তি না গেলেও মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য মনে করে শক্তি চলে এসেছে।
খেলোয়াড়রা এই পানীয়টি গিলে না ফেলে মুখে নিয়ে ফেলে দেওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, তীব্র দৌড়ঝাঁপের সময় বেশি তরল বা চিনিযুক্ত পানীয় পেটে গেলে অস্বস্তি, বমিভাব কিংবা হজমের সমস্যা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, একবারে বেশি পানীয় গিলে ফেললে পেট ভারী লাগে, যা দৌড়ানোর গতি ও স্বস্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তৃতীয়ত, মুখে কিছুক্ষণ রেখে ফেলে দিলেও কাঙ্ক্ষিত স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া বা ক্লান্তি কমার সুবিধাটি পুরোপুরি পাওয়া যায়, ফলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পেট ভরানোর প্রয়োজন পড়ে না।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেট রিন্সিং পদ্ধতি ব্যবহার করা সাইক্লিস্টরা ৪০ কিলোমিটারের একটি পরীক্ষায় আগের তুলনায় দ্রুত সময়ে রেস শেষ করতে পেরেছিলেন। এ কারণে ফুটবলের পাশাপাশি সাইক্লিং, ম্যারাথনসহ দীর্ঘ সময়ের সহনশীলতার অন্যান্য খেলায়ও এই পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশল সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করলেও এটি শরীরের প্রকৃত শক্তির দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করে না। তাই ৯০ বা ১২০ মিনিটের ম্যাচে খেলোয়াড়দের ম্যাচের আগে, হাফটাইমে বা সুযোগ বুঝে পর্যাপ্ত পানি, ইলেকট্রোলাইট ও আসল কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করতেই হয়।
যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়ামবিজ্ঞানী লিন্ডসে বটমসও মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের খেলায় শরীরের মূল শক্তির ঘাটতি পূরণে কিছু পরিমাণ তরল ও কার্বোহাইড্রেট সরাসরি পেটে যাওয়াও জরুরি।
সময়ের আলো/জেডি