এক লড়াকু যোদ্ধার সংগ্রামী জীবন

আরমান মুকুল

খেলা

বিশ্বকাপের মঞ্চে টাইব্রেকারের শেষ শটটি জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে সুইজারল্যান্ড। আর ঠিক উল্টো প্রান্তে নীরবে ভেঙে পড়েন লুইস দিয়াজ।

2026-07-09T04:16:37+00:00
2026-07-09T04:16:37+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
এক লড়াকু যোদ্ধার সংগ্রামী জীবন
আরমান মুকুল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৬ এএম 
লুইস দিয়াজ। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মঞ্চে টাইব্রেকারের শেষ শটটি জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে সুইজারল্যান্ড। আর ঠিক উল্টো প্রান্তে নীরবে ভেঙে পড়েন লুইস দিয়াজ। সতীর্থদের সান্ত্বনা, গ্যালারির করতালি কিংবা সমর্থকদের ভালোবাসা এদিন কোনো কিছুই যেন তার কষ্ট কমাতে পারেনি। শেষ ষোলোতেই শেষ হয়ে যায় কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। 

কিন্তু যারা লুইস দিয়াজের জীবনটা জানেন, তারা জানেন এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় হার নয়। কারণ মাঠের বাইরের লড়াইগুলো ছিল আরও কঠিন, আরও নির্মম। আজ যিনি বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে ইউরোপ কাঁপান, যিনি কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা, তার শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত লা গুয়াহিরা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া দিয়াজের পরিবারে অনেক সময়ই পর্যাপ্ত খাবার থাকত না। ক্ষুধা ছিল নিত্যসঙ্গী। অপুষ্টিতে ভুগে একসময় তার শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে অনেকেই বিশ্বাস করতেন না, এই ছেলেটি কোনোদিন পেশাদার ফুটবলার হতে পারবে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় বিশ্বাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির। সেই বিশ্বাস নিয়েই ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন দিয়াজ। স্থানীয় মাঠ থেকে শুরু করে কলম্বিয়ার লিগ, এরপর পর্তুগালের পোর্তো হয়ে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লিভারপুল সবশেষ জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে খেলেন। প্রতিটি ধাপ তিনি পেরিয়েছেন নিজের মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে। আজ তিনি শুধু দেশের সেরা ফুটবলারই নন, বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর উইঙ্গার। তবে ভাগ্য যেন বারবার তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে।

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর হঠাৎ করেই বদলে যায় দিয়াজ পরিবারের জীবন। কলম্বিয়া-ভেনেজুয়েলা সীমান্তের ব্যারানকাস শহরের একটি পেট্রোল স্টেশন থেকে মোটরসাইকেলে এসে তার বাবা লুইস ম্যানুয়েল দিয়াজ এবং মা সিলেনিস মারুলান্দাকে অপহরণ করে কলম্বিয়ার গেরিলা সংগঠন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ইএলএন)। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনী তার মাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও বাবাকে নিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। শুরু হয় অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অপেক্ষা। দিন গড়ায়, কিন্তু বাবার কোনো খোঁজ মেলে না। পুরো কলম্বিয়া উদ্বেগে প্রহর গুনতে থাকে। সেই সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন দিয়াজ। লিভারপুল ছেড়ে দেশে ফিরে যান। পরিবারের পাশে দাঁড়ান। পরে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় আবার ইংল্যান্ডে ফিরে দলের হয়ে মাঠে নামেন। কিন্তু তার চোখেমুখে তখনও ছিল একটাই আকুতি, বাবাকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।


প্রিমিয়ার লিগে গোল করার পর তিনি জার্সি তুলে ভেতরের টি-শার্টে লেখা ‘Freedom for Papa’ বার্তাটি দেখান। মুহূর্তটি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ফুটবল মাঠে একটি গোল উদযাপন যে কখনো একজন সন্তানের অসহায় আর্তনাদ হয়ে উঠতে পারে, সেটি নতুন করে দেখেছিল বিশ্ব। দিয়াজ একা ছিলেন না। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল লিভারপুল, কলম্বিয়া জাতীয় দল, ফুটবল ফেডারেশন, সতীর্থ, সমর্থক এমনকি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রাও। মা উদ্ধার হওয়ার পর বাবার মুক্তির দাবিতে মা-সহ পরিবারের সদস্যরা রাস্তায় নেমে বাবার মুক্তির দাবিতে মিছিল করেন। সরকার, সেনাবাহিনী ও মধ্যস্থতাকারীদের দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ১২ দিন পর গেরিলারা লুইস ম্যানুয়েল দিয়াজকে মুক্তি দেয়। হেলিকপ্টারে করে তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়। সেই খবর শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব।

এরপর আবারও ফুটবলে মন দেন দিয়াজ। ব্যক্তিগত সব যন্ত্রণা বুকে চেপে দেশের জন্য লড়ে যান। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ছিলেন কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তার গতিময় দৌড়, নিখুঁত ড্রিবলিং আর গোল তৈরির ক্ষমতায় অনুপ্রাণিত হয়ে শেষ ষোলো পর্যন্ত পৌঁছে যায় কলম্বিয়া। কিন্তু নকআউটের নিষ্ঠুর বাস্তবতা কাউকে ছাড় দেয় না। 

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ভাগ্য আর স্নায়ুর পরীক্ষায় হেরে যায় কলম্বিয়া। স্বপ্নভঙ্গ হয় দিয়াজদের। মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি। চোখে-মুখে স্পষ্ট হতাশা, কিন্তু তাতেও তার গল্পের সৌন্দর্য কমে না।

কারণ লুইস দিয়াজের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় বিশ্বকাপের একটি হার নয়। তার পরিচয় একজন মানুষ, যিনি ক্ষুধাকে হারিয়েছেন, দারিদ্র্যকে হারিয়েছেন, বাবাকে হারানোর ভয়কে জয় করেছেন এবং প্রতিটি ধাক্কার পর আরও শক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন।

ফুটবলে ট্রফি সবসময় সেরার পরিচয় দেয় না। কিছু মানুষ নিজেদের জীবন দিয়েই কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। লুইস দিয়াজ সেই বিরল মানুষদের একজন। তার গল্প শেখায়, জীবনের সবচেয়ে কঠিন ম্যাচগুলো খেলা হয় সবুজ ঘাসের মাঠে নয়, বরং মানুষের বুকের ভেতর।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   লুইস দিয়াজ  বিশ্বকাপ 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: