মেসির অশ্রুতে লেখা উপাখ্যান

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

কান্নারও আছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। কখনো তা বিদায়ের, কখনো অপূর্ণ স্বপ্নের, আবার কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করার উচ্ছ্বাসের। ২০২৬ বিশ্বকাপের মাত্র

2026-07-09T04:18:29+00:00
2026-07-09T04:18:29+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
মেসির অশ্রুতে লেখা উপাখ্যান
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৮ এএম 
লিওনেল মেসি। ছবি : সংগৃহীত
কান্নারও আছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। কখনো তা বিদায়ের, কখনো অপূর্ণ স্বপ্নের, আবার কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করার উচ্ছ্বাসের। ২০২৬ বিশ্বকাপের মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ফুটবল দুনিয়া দেখল তিন মহাতারকার চোখের জল। নেইমার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং সর্বশেষ লিওনেল মেসি। তিনজনই কেঁদেছেন, তবে তিনটি ভিন্ন অনুভূতির কারণে।

নেইমার ও রোনালদোর কান্না ছিল স্বপ্নভঙ্গের। আর মেসির চোখের জল ছিল অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের স্বস্তি, চাপমুক্তির আনন্দ এবং দলের লড়াই সফল হওয়ার আবেগের বহিঃপ্রকাশ। তিন দিন আগে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ম্যাচের শেষ গোলটি করেছিলেন নেইমারই। কিন্তু সেই গোলও দলকে বাঁচাতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলের এই তারকা। সতীর্থরা তাকে ঘিরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের যন্ত্রণা তখন কোনো কথাতেই কমার নয়। চোখের জলেই ভেসে গেছে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন। বিদায় নেইমার জুনিয়র!

একদিন পর একই দৃশ্য দেখা যায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রে। স্পেনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। প্রথমে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করেছিলেন রোনালদো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি। টানেল ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখের জল মুছছিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা। সেটিও ছিল হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ের বেদনার কান্না। আর ঠিক পরদিনই কাঁদলেন লিওনেল মেসি। তবে তার কান্নার অর্থ ছিল একেবারেই আলাদা।

আটলান্টায় মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখন বিদায়ের শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এরও আগে ১৯ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। সেই মুহূর্তে হয়তো তিনিও ভেবেছিলেন, তার ভুলেই শেষ হয়ে যেতে পারে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লিখে রাখে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের জন্য।


৭৯ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ব্যবধান কমানোর পর বদলে যায় ম্যাচের গতি। কয়েক মিনিট পর নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন মেসি। সমতাসূচক গোল করে আবারও জাগিয়ে তোলেন আর্জেন্টিনাকে। এরপর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুই বা তার বেশি গোলে পিছিয়ে থেকেও জয় পায় আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশি বাজতেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মেসি। সতীর্থদের উল্লাসের মাঝেই চোখ ভিজে ওঠে তার। চার বছর আগে বিশ্বকাপ জয়ের রাতেও যাকে এতটা আবেগাপ্লুত দেখা যায়নি, সেই মেসিই এবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে নিজের আবেগের কারণও জানান তিনি। মেসি বলেন, ‘পেনাল্টি মিস করার পর আমি নিজের ওপর খুব রেগে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি পুরো দলকে ডুবিয়ে দিলাম।’ তবে তিনি দলের মানসিক শক্তিরও প্রশংসা করেন। তার ভাষায়, ‘২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে ফিরে আসা সহজ নয়। এই দলটা বারবার প্রমাণ করেছে, তারা কখনো বিশ্বাস হারায় না। এই দলের অংশ হতে পারা আমার জন্য গর্বের।’

তবে ম্যাচটি শুধু প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বিতর্কের কারণেও আলোচনায় এসেছে। দ্বিতীয়ার্ধে মিসরের একটি গোল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। সেই সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মন্তব্য করেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি গ্রাহাম স্কট। তার মতে, গোলের আগে যে শারীরিক সংস্পর্শ হয়েছিল, তা ছিল স্বাভাবিক ফুটবলীয় লড়াই এবং ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার মতো স্পষ্ট ফাউল নয়।

একই মত দিয়েছেন সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও। তার দাবি, মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ভিএআর অপ্রয়োজনীয়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এবং এই সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষেই গেছে। অন্যদিকে, ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশ্লেষক ড. জো মাচনিকের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী গোল হওয়ার আগে আক্রমণের সূচনায় ফাউল হয়ে থাকলে গোল বাতিল করা বৈধ। তাই নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ম্যাচ শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিসরের কোচ হোসাম হাসানও। তার অভিযোগ, মাঠের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু বিষয় ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করেছে। এমনকি তিনি দাবি করেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও মেসিকে টুর্নামেন্টে রাখার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। সব বিতর্কের পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসিই। কারণ তিনি আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বলা হয়। একটি পেনাল্টি মিস তাকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে গোল করে দলকে ফিরিয়ে এনেছেন ম্যাচে, নেতৃত্ব দিয়েছেন অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে।

নেইমার ও রোনালদোর চোখের জল ছিল বিদায়ের প্রতীক। আর মেসির কান্না ছিল নতুন স্বপ্নের। সেই কান্না জানিয়ে দিল, বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষুধা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই হলেও তার হৃদয়ে এখনও একই আগুন, একই বিশ্বাস।

কোয়ার্টার ফাইনালে এখন আর্জেন্টিনার সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। তবে মিসরের বিপক্ষে এই রাত আবারও প্রমাণ করল। লিওনেল মেসি মাঠে থাকলে শেষ বাঁশি বাজার আগে আর্জেন্টিনার গল্প কখনো শেষ হয়ে যায় না।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   লিওনেল মেসি  বিশ্বকাপ 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: