গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এক বছর আগে উদ্ধার করা হাতি রাজু বাহাদুর। হাতিশালায় অন্য একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে সামনের দুই পা ভেঙে গেছে তার। বর্তমানে দাঁড়াতে না পেরে বালুর ওপর শুয়ে থেকেই দিন কাটছে প্রাণীটির। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা তো দূরের কথা, খাবারও গ্রহণ করতে হচ্ছে শুয়ে শুয়েই। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রাণীপ্রেমী ও পার্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পার্ক সূত্রে জানা গেছে, রাজু বাহাদুরের চিকিৎসায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। থাইল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও হাতিটির অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় তার বেঁচে থাকা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সহকারী বন সংরক্ষক) মো. তারেক রহমান বলেন, হাতিশালায় হাতিদের মধ্যে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ হয়, যা স্বাভাবিক আচরণের অংশ। অন্য একটি হাতির ধাক্কায় রাজু বাহাদুর মাটিতে পড়ে গিয়ে সামনের দুই পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে। চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে হাতিটি দাঁড়াতে পারছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্কের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৪ মে হাতিশালার অন্য একটি হাতির আক্রমণের শিকার হয় রাজু বাহাদুর। গুরুতর আহত হওয়ার কয়েক দিন পর ক্রেনের সাহায্যে তাকে নিরাপদ স্থানে বালুর ওপর স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানেই নিবিড় পরিচর্যা ও চিকিৎসা চলছে। দাঁড়াতে না পারায় শুয়ে থেকেই অল্প পরিমাণ খাবার গ্রহণ করছে যা তার চাহিদার চেয়ে অনেক কম। তার শারীরিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী বা বন্দি অবস্থায় থাকা প্রাণীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাজু বাহাদুরের আঘাত অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। হাতিশালা সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিষেধ করা হয়েছে।
এদিকে পার্কে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী ও প্রাণীপ্রেমী কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে বলেন, এত বড় প্রাণীকে একই স্থানে রাখার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। এমন সংঘর্ষ এড়াতে আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। এর জন্য কর্তৃপক্ষ অবশ্যই দায়ী। তারা দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, একসময় মানুষের নির্যাতনের শিকার হয়ে বন বিভাগের উদ্ধার অভিযানে নতুন জীবনের আশা পেয়েছিল রাজু বাহাদুর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই হাতিটিই আজ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। প্রতিদিন শুয়ে শুয়ে কষ্টে খাবার গ্রহণ করা রাজু বাহাদুরকে ঘিরে সাফারি পার্কের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও বিরাজ করছে গভীর উদ্বেগ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকা থেকে জীর্ণ, অসুস্থ ও আহত অবস্থায় রাজু বাহাদুরকে উদ্ধার করে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। অভিযোগ ছিল, হাতিটিকে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করা হচ্ছিল।
অভিযানের সময় হাতিটির তৎকালীন মালিক আতিকুর রহমানকে আটক করা হয় এবং হাতিটি বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়। উদ্ধারকালে হাতিটির বয়স ছিল প্রায় ৯ বছর। বর্তমানে তার বয়স ১০ বছরের বেশি। উদ্ধারের পর থেকেই রাজু বাহাদুরকে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় রাখা হয়। সম্প্রতি হাতিশালায় থাকা আরেকটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির সঙ্গে আচমকা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তার সামনের দুটি পায়ে মারাত্মক ফ্র্যাকচার হয়।
সময়ের আলো/আআ