ফুটবল তো কেবল বাইশজন খেলোয়াড়ের পায়ে বল ঘোরানোর কোনো সাধারণ খেলা নয়; এটি আসলে কোটি কোটি মানুষের ধকধক করতে থাকা হৃদস্পন্দনের অন্য নাম। মাঠের সবুজ ঘাসে যখন একটি মাত্র গোল হয়, তখন তা কেবল স্কোরবোর্ডের সংখ্যাটাকেই বদলে দেয় না, রাতারাতি বদলে দেয় আস্ত একটি দেশের চেনা রাত। স্ট্রাইকারের পা থেকে ফস্কে যাওয়া একটি গোল মিসের ব্যর্থতা মুহূর্তেই কোটি মানুষের বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস হয়ে নেমে আসে।
পেনাল্টি মানে তো কেবল রেফারির ঠোঁটে থাকা বাঁশির শব্দ নয়, সেটি যেন পুরো একটি জাতির হৃদস্পন্দন সাময়িকভাবে থামিয়ে দেওয়ার এক রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। আর মাঠের বুক থেকে ছিটকে যাওয়া একটি লাল কার্ড কেবল একজন খেলোয়াড়কে সীমানার বাইরে পাঠায় না, নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয় একটা গোটা দেশের চার বছরের লালিত স্বপ্নকে।
ম্যাচ শুরু হতে তখনও কয়েক মিনিট বাকি। ক্যামেরা যখন মাঠ ছেড়ে গ্যালারির দিকে তাক করে, তখন সেখানে ভেসে ওঠে হাজারো মুখের এক জীবন্ত ক্যানভাস। সেখানে কেউ প্রিয় দেশের জাতীয় পতাকাটি পরম মমতায় শরীরে জড়িয়ে বসে আছেন, কেউবা গভীর ভালোবাসায় নিজের মুখে এঁকে নিয়েছেন স্বদেশের রঙের আঁচড়। কোনো এক বাবা পরম আদরে নিজের ছোট্ট ছেলেকে কাঁধে তুলে রেখেছেন, আবার কোনো এক বৃদ্ধা গ্যালারির কোণে বসে দুই হাত জোড় করে মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকছেন। কেউ আবার চোখ জোড়া বন্ধ করে পুরো আবেগ ঢেলে গাইছেন নিজের দেশের জাতীয় সংগীত। ঠিক সেই মুহূর্তটিতে, গ্যালারির ওই মানুষগুলো আর কেবল দর্শক থাকেন না, তারা হয়ে ওঠেন আস্ত একটা দেশের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
মাঠের বল যখন ডান প্রান্ত থেকে বাম প্রান্তে ছুটে বেড়ায়, গ্যালারির হাজার হাজার মানুষ তখন এক অদৃশ্য টানে একসঙ্গে মেতে ওঠে, একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। শটটি যদি গোলপোস্টের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে বাইরে চলে যায়, তবে পুরো স্টেডিয়াম যেন একযোগে হাহাকার করে ওঠে। আবার বলটি যখনই জাদুকরি ছোঁয়ায় জালের ভেতর আছড়ে পড়ে, তখন গ্যালারিতে বসা সম্পূর্ণ অচেনা দুজন মানুষও জাত-পাত ভুলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদে ভাসায়। পৃথিবীর বুকে মানুষের ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, আলাদা হতে পারে ধর্মও; কিন্তু ফুটবলের মাঠে আনন্দের ভাষা তো একটাই!
চলতি বিশ্বকাপে এই চেনা আবেগের রং যেন আরও বেশি গাঢ়, আরও বেশি তীব্র হয়ে ধরা দিয়েছে। যখন শক্তিশালী ব্রাজিলের যাত্রা নরওয়ের কাছে হেরে থমকে গেল, তখন সেই বিদায়ের করুণ সুর কেবল মাঠের খেলোয়াড়দের চোখেই জল আনেনি। গ্যালারিতে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা হাজারো ব্রাজিলিয়ান সমর্থক যেন এক নিমেষে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারও হাতে তখনও শক্ত করে ধরা জাতীয় পতাকা, কারও গালে লেপ্টে আছে সবুজ-হলুদ রং। কিন্তু সবার চোখের কোণে জমা হয়েছিল ঠিক একই প্রশ্ন-এতটা দ্রুত কীভাবে শেষ হয়ে গেল আমাদের চার-চারটি বছরের লালিত স্বপ্ন? অন্যদিকে, শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ের খেলোয়াড়রা যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাসে মেতে উঠলেন, তা যেন ছিল একটা গোটা জাতির দীর্ঘদিনের জমানো প্রতীক্ষার এক জাদুকরি বিস্ফোরণ।
এই আসরে মরক্কোর সমর্থকদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ফুটবল কেন কখনো স্রেফ একটা খেলা হতে পারে না। তাদের প্রিয় দল ম্যাচ হেরে যাওয়ার পরও তারা যেভাবে গ্যালারি থেকে খেলোয়াড়দের জন্য করতালি দিয়ে গেছেন, তা সত্যিই অনন্য। কারণ, কিছু কিছু সম্মানজনক পরাজয়ও ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। সেদিন তাদের চোখেও জল ছিল, তবে সেই জল কোনো অপমানের বা গ্লানির ছিল না, তা ছিল বুকভরা গর্বের। আবার অন্যদিকে, স্পেনের তরুণ ফুটবলাররা যখন মাঠে একের পর এক গোল করে মেতে উঠছেন, গ্যালারি তখন যেন চিৎকার করে ফুটবলের নতুন একটি প্রজন্মের জন্মকে উদযাপন করছে। ঠিক তার বিপরীতে, বেলজিয়ামের একসময়ের বিখ্যাত ‘সোনালি প্রজন্ম’ ধীরে ধীরে তাদের বিদায়ের শেষ প্রান্তে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঠের প্রতিটি পাস, প্রতিটি নিখুঁত শট আর ছোট ছোট ভুলগুলো যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে-এমন সোনালি সুযোগ হয়তো তাদের জীবনে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কতশত আবেগি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ১৯৯৪ সালের সেই বিখ্যাত বিশ্বকাপের ফাইনাল, যেখানে রবার্তো বাজ্জিও টাইব্রেকারের শেষ পেনাল্টি শটটি আকাশের দিকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন কেবল একজন ফুটবলার ভেঙে পড়েননি, বাজ্জিওর সেই এক শটে কেঁদে উঠেছিল পুরো ইতালি। সেই শূন্যে তাকিয়ে থাকা বাজ্জিওর ছবিটা আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে। কিংবা ২০০৬ সালের সেই ফাইনাল ম্যাচ, যেখানে কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান প্রতিপক্ষের বুকে মাথা ঠুকে লাল কার্ড দেখে মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়েছিলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ঘটনা একজন মহানায়কের বিদায়ের পুরো গল্পটাকেই ওলটপালট করে দিয়েছিল। সেদিন ট্রফি জেতার আনন্দের চেয়েও বিশ্বজুড়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল জিদানের সেই বিদায়ের মুহূর্তটি নিয়ে।
আবার ২০১৪ সালের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা মনে করুন, যেখানে জার্মানির কাছে ঘরের মাঠে সাতটি গোল খেয়েছিল ব্রাজিল। সেই রাতে মাঠের ক্যামেরাম্যান বারবার মাঠ ছেড়ে গ্যালারির দিকে ক্যামেরা ধরছিলেন-সেখানে কেউ নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, কেউ চরম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছেন, আবার কোনো বাবা নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে সেই রাতটি আজও একটি পুরো জাতির মানসিক ক্ষতের চিরস্থায়ী প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে। তবে এর ঠিক বিপরীত এক উৎসবের আমেজ দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালের বিশ্বকাপে, যেখানে মরক্কোর প্রতিটি জয় ছিল একেকটি রূপকথার মতো। রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা থেকে শুরু করে মারাকেশ-পুরো দেশ যেন আনন্দের বন্যায় রাস্তায় নেমে এসেছিল। শুধু মরক্কো কেন, আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষ সেই ঐতিহাসিক জয়কে নিজেদের জয় মনে করে বুনো উল্লাসে মেতে উঠেছিল। ফুটবল সেদিন ভৌগোলিক সীমানার সব দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
আসলে, বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটি বোধহয় সেই ফুটবলার, যিনি পেনাল্টি শুট-আউটের সময় গোল করতে মিস করেন। স্টেডিয়ামের হাজার হাজার জোড়া চোখের সামনে তিনি সবুজ মাঠে একদম একা দাঁড়িয়ে থাকেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাকে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বল জালে জড়ালে তিনি রাতারাতি হয়ে যান দেশের নায়ক, আর সামান্য ভুলে মিস হলেই মুহূর্তের মধ্যে বনে যান খলনায়ক। ঠিক একইভাবে, বিপক্ষ দলের নিশ্চিত গোল যখন একজন গোলকিপার অসম্ভব এক ডাইভ দিয়ে সেভ করে দেন, তখন তিনি আসলে কেবল বল আটকান না, বাঁচিয়ে দেন একটা আস্ত দেশের নিভে যাওয়া স্বপ্নকে। মাঠের সতীর্থরা তখন পাগলের মতো ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন, গ্যালারির হাজারো কণ্ঠ তার নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে, আর দূর দূরান্তে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা কোটি কোটি মানুষ একযোগে আনন্দের চোটে লাফিয়ে ওঠে। তখন মনে হয়, মাঠের একটা দুর্দান্ত সেভও বোধহয় একটা দর্শনীয় গোলের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান!
গ্যালারির এই আসনগুলোতে কেবল একদল দর্শকই বসে থাকেন না, সেখানে আসলে নিঃশব্দে বসে থাকে হাজার হাজার অসমাপ্ত এবং না-বলা গল্প। গ্যালারির কোনো এক কোণে হয়তো একজন বাবা তাঁর ছোট্ট সন্তানের হাত শক্ত করে ধরে জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ দেখাচ্ছেন। অন্য কোনো প্রান্তে হয়তো এক অশীতিপর বৃদ্ধ জীবনের শেষবারের মতো তাঁর প্রিয় দলের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছেন। আবার কোনো এক অবুঝ শিশু বড়দের আবেগ দেখে আস্তে আস্তে বুঝতে শিখছে-ফুটবল নামের এই গোল চামড়ার বলটি কেন মানুষের জীবনের এত বড় এবং অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ!
ম্যাচ শেষ হয়। একসময় মাঠের শেষ বাঁশিটি বেজে ওঠে। স্টেডিয়ামের প্রখর ফ্লাডলাইটগুলো একে একে নিভতে শুরু করে এবং গ্যালারিও ধীরে ধীরে একদম ফাঁকা হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া কিছু কান্না যেন সিটের ওপর অলক্ষ্যেই জমা হয়ে থাকে, আর কিছু আনন্দের চিলতে হাসি বাতাসের সঙ্গে মিশে স্টেডিয়ামের আকাশে ভেসে বেড়ায়। খেলোয়াড়রা ক্লান্ত শরীরে ড্রেসিংরুমে ফিরে যান, দর্শকেরা ফিরে যান যার যার ঘরে, কিন্তু সেই জাদুকরি রাতের গভীর আবেগ মানুষের মনে থেকে যায় বহু বহু বছর।
ফুটবলের ইতিহাস তো শুধু ট্রফি উঁচিয়ে ধরা বিজয়ী দলগুলোর একার নয়। এই ইতিহাস আসলে অলক্ষ্যে লেখা হয় সেই একনিষ্ঠ সমর্থকের চোখের জলে, যিনি নিজের দল হেরে যাওয়ার পরও দেশের প্রিয় পতাকাটি পরম যত্নে বুকের ভেতর জড়িয়ে রাখেন। এই ইতিহাস পরম আদরে লেখা হয় সেই নিষ্পাপ শিশুর খিলখিল হাসিতে, যে তাঁর বাবার কাঁধে চড়ে প্রথমবার নিজের দেশের ঐতিহাসিক জয় চাক্ষুষ করেছে। তাই তো, বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর আর মায়াবী দৃশ্যটা মাঠের ভেতরে নয়, বরং লুকিয়ে থাকে গ্যালারির ওই গাদাগাদি করে বসা ভিড়ের মাঝে। যেখানে প্রতি মুহূর্তে একই সঙ্গে জন্ম নেয় হাসি আর কান্না, জয় আর বেদনা, কারো বিদায়ের সুর আর কারো নতুন স্বপ্নের পথচলা!
সময়ের আলো/আরবিএন