১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করলেন এক ঝাঁক তারকা সাহিত্যিক-কবি। এরা সবাই ১৯৬১ সালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রথম বর্ষে। সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র ভর্তি হতে প্রস্তুত ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, আইন বা ইংরেজিতে—তারা প্রায় অনেকেই ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। কারণ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রবীন্দ্রনাথকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করেন। রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ। রবীন্দ্রনাথ প্রকাশে পাঠ ও আলোচনা বন্ধ। তারই প্রতিবাদে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার হিড়িক পড়ে। আবুল কাসেম ফজলুল হকও ১৯৬১ সালে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়া ছাত্র। যদিও এই দেশে তাৎপর্য যে গুণাবলি প্রদর্শন করেন কেউ, বয়স বাড়লে তাৎপর্য সেই স্পর্শিত জায়গা থেকে সরে আসেন কেউ কেউ। ইউটার্ন পর্যন্ত নিয়ে থাকেন।
বাংলা বিভাগ থেকে পাস করে বেরিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা বিভাগেই জয়েন করেন। চিন্তাশীল প্রবন্ধ রচয়িতা হিসেবে তার একটি জায়গা রয়েছে পাঠকের কাছে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাম ঘেরানায় বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার একটি অবস্থান তৈরি করেন। বাংলা বিভাগে শিক্ষকতার পাশাপাশি 'লোকায়ত' নামে একটি মননশীল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘ বছর।
সাম্প্রতিক সময়ে স্যারের আরেকটি পরিচয় সবার সামনে এসেছে। তার ছেলে দীপনকে কয়েক বছর আগে খুন হতে হয়। পিতার কাঁধে সন্তানের মরদেহ উঠল। এই বাস্তবতা বড় নির্মম। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই নির্মমতায় শিখান। পুত্র দীপন হত্যার পর স্যারের মনোজগতে এক বিরাট ধাক্কা লাগে। সেই ছবিটি আজও আমাদের সামনে ভাসে, দীপনকে হত্যার পর যখন সাংবাদিকরা তার সামনে যান, স্যারের চোখে টলমল অশ্রু, তিনি বলেছেন, ‘এই দেশে আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই না আমি।’ ফেসবুকে ছবিটা ভাইরাল হয়ে ঘুরেছে।
সর্বশেষ বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে অনেকটা আড়ম্বরহীন ছিলেন। সবসময়ই চিন্তাভাবনায় সিরিয়াস থাকতেন। এতে করে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় যে প্রবণতা, তা তিনি বহন করতেন না।
রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনি টেকনিকপন্থী ছিলেন। এমনই শুনেছি আমরা। কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান দুই দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনোটাতেই যুক্ত হননি তিনি। তবে এ কথা ঠিক, তিনি বাম ধারায় প্রতি ঝুঁকে ছিলেন। প্রায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হলেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, স্যারের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। তার সম্পাদিত পত্রিকায় ‘লোকায়ত’ লিখতাম। লেখায় প্রুফ দেখতে স্যারের বাসায় যেতাম। তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের বাসা ছিল কলাভবনের ঠিক উল্টোদিকের একটি কোয়ার্টারের দোতলায়। প্রুফ দেখে ভাত খেয়ে হলে ফিরতাম। দীপন স্যারের পুত্র তখন কলেজে পড়ত। দীপনের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'জাগৃতি' ছিল শাহবাগ আজিজ মার্কেটে এবং আরও পরে কাঁটাবনে। দীপনও একরকম বন্ধু হয়ে ওঠে আমাদের। কী নির্মমভাবে দীপনকে হত্যা করা হয়। স্যার ও তার পুরো পরিবারকেই সেই আঘাত সইতে হয়েছে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রয়াত হলেন। তার চিন্তা, তার প্রচেষ্টা—কিছু ছাপছোপ তো রয়েই গেল, লেখালেখি। সেগুলোই আমাদের বা পাঠকের কাছে এখন মূল বিচারে সম্পদ। আপনাকে চিরদিন মনে রাখতে পারব— স্যার, আপনাকে শ্রদ্ধা।
সময়ের আলো/আআ