বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু স্রষ্টা আছেন, যাদের সাহিত্যিক পরিচয় কোনো একটি ধারায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের সৃজনশীলতা বিচরণ করেছে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য ও সাংবাদিকতার বিস্তৃত পরিসরে। কবি আল মুজাহিদী সেই বিরলপ্রজ স্রষ্টাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক, কলামিস্ট, সাংবাদিক এবং সমাজসচেতন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা-সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক ও তাত্ত্বিক চিন্তক।
আল মুজাহিদী ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার হেমনগর এলাকার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল পরিবেশ, লোকঐতিহ্য ও প্রকৃতির নিবিড় সংস্পর্শ তার সাহিত্যমানসে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্য এই দুই ভিন্ন শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা তার সাহিত্যচিন্তাকে দিয়েছে একই সঙ্গে মানবসমাজের গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টি এবং নন্দনতাত্ত্বিক সংবেদনশীলতা।
দীর্ঘ তিন যুগ তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সম্পাদনায় অসংখ্য নবীন ও প্রতিষ্ঠিত লেখকের সাহিত্যচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলা, উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় তার সাবলীল বক্তৃতাদানের দক্ষতা তাকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত করে তোলে।
আল মুজাহিদীর জীবন কেবল সাহিত্যসাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি এবং বাংলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বহুল পরিচিত ‘ছাত্রলীগ সংগীত’ তারই রচনা।
ষাট দশকের আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাকে ছয়বার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কেবল একজন সংগঠকই ছিলেন না; বরং মুক্তিযুদ্ধের তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যা, গেরিলা যুদ্ধের দর্শন প্রচার এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ন্যায্যতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারতের দিল্লির কোটলা শাহ প্যারেড গ্রাউন্ডে হিন্দি ভাষায় তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বক্তৃতা সে সময় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
আল মুজাহিদীর সাহিত্যসত্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কবিতা। তার কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ইতিহাস, যুদ্ধ, মানবসভ্যতার সংকট, প্রেম, প্রকৃতি, মৃত্যু, সময়, অস্তিত্ব ও বিশ্বমানবতার গভীর প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, দূত পারাবত, মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা, ঈভের হেমলেট, কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি, প্রিজন ভ্যান, দিদেলাস ও ল্যাবিরিন্থ, যুদ্ধনান্তি, সিল্যুএট, অ্যাকাডেমাসের বাগান, সমুদ্র মেখলা, সৌর জোনাকি, পৃথিবীর ধুলো, একা অনন্তে, কালের বন্দিশে, পাথর ও প্যাপিরাস, সন্ধ্যার বৃষ্টি, প্রাচ্যপৃথিবী, দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনি, ভিতা নুওভা, কালের কারাভা এবং পাখির পৃথিবী।
তার কবিতার ভাষা কখনো ধ্রুপদী, কখনো আধুনিক প্রতীকসমৃদ্ধ; কখনো ইতিহাসসচেতন, কখনো গভীর মানবিক বোধে উজ্জ্বল। বিশ্বসাহিত্য, পুরাণ, দর্শন ও ইতিহাসের অনুষঙ্গ তার কবিতাকে এক বিশেষ বৌদ্ধিক মাত্রা প্রদান করেছে।
গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেও আল মুজাহিদী ছিলেন স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। তার গল্পগ্রন্থ বাতাবরণ, প্রপঞ্চের পাখি, ভরাকটাল মরাকটাল ও বলধা গার্ডেনে সমকালীন সমাজ, মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসে তিনি ইতিহাস, প্রেম, রাজনীতি, মানবিক সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়কে শিল্পিত রূপ দিয়েছেন। চাঁদ ও চিরকুট, কালমিতি উপাখ্যান, আর্কিওপটেরিকস, সোন্যাটা, প্রথম প্রেম, মানববসতি, কাঁটা ও কমল এবং দিনবদল তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
নাট্যকার হিসেবেও তিনি ছিলেন সৃজনশীল। তার নাটক ভঙ্গুর গোলাপ ও আলবাট্রাস মানবসম্পর্ক, সমাজসংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে নাট্যরূপ দিয়েছে।
শিশুসাহিত্যেও তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিশুদের জন্য তিনি রচনা করেছেন নাটক, কবিতা, ছড়া এবং কিশোর উপন্যাস। পাখির পৃথিবী, কেতন কুশল কেতকী ও লাল টুকটুকে সুয্যি শিশুনাটক হিসেবে পরিচিত।
তার ছড়াগ্রন্থগুলোর মধ্যে হালুম হুলুম, তালপাতার সেপাই, শেকল কাটে খাঁচার পাখি, গড়ের মাঠের ছড়া, আকাশ আকাশ মেঘলা, পাখির নাম হরবোলা, খোকার আকাশ এবং ছোট্ট ছোট্ট ছড়া শিশু-কিশোরদের কাছে জনপ্রিয়।
এ ছাড়া ইস্টিশানে হুইসেল, সোনার মাটি রুপোর মাটি এবং পালকি চলে দুলকি তালে কিশোর কবিতার উল্লেখযোগ্য সংযোজন। কিশোর উপন্যাসের মধ্যে ছুটির ছুটি, লালবাড়ির হরিণ, আলোর পাখিটা, রুপোলি রোদ্দুর, টুপুনের ডায়েরি, খোকার যুদ্ধ, লাল লণ্ঠন, চাঁদের দেশে চাঁদমনি এবং মাটির পুতুল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আল মুজাহিদীর প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ কালান্তরের যাত্রী, বৈতালিকী এবং কাল কালাধার তার চিন্তার গভীরতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
অনুবাদক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। তিনি হাইনরিশ হাইনে, কাইফি আজমি, আহমদ ফরাজ এবং বাহাদুর শাহ জাফরের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এ ছাড়া শিকওয়াহ জওয়াবে শিকওয়াহ অনুবাদের মাধ্যমে উপমহাদেশীয় সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলা পাঠকের সেতুবন্ধ রচনা করেছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইরান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, দুবাই, মাসকাটসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ভারতীয় সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার পরিচায়ক।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক (২০০৩) লাভ করেন। এ ছাড়া জীবনানন্দ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, শেরেবাংলা স্মৃতি পুরস্কার, ত্রিভুজ সাহিত্য স্বর্ণপদক, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য সংসদ পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।
দীর্ঘদিন কিডনি, হৃদরোগ এবং বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন আল মুজাহিদী। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২৬ সালের ১৯ জুন রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারায় এক বহুমাত্রিক স্রষ্টাকে, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন কবি, চিন্তক, সম্পাদক, অনুবাদক এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী একজন সাংস্কৃতিক সংগ্রামী।
আল মুজাহিদীর সাহিত্যজীবন প্রমাণ করে যে প্রকৃত সাহিত্য কেবল নন্দনতত্ত্বের অনুশীলন নয়; এটি ইতিহাস, সমাজ, মানুষ ও মানবমুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার কবিতায় যেমন বিশ্বমানবতার আর্তি উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি তার প্রবন্ধে প্রকাশ পেয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, তার উপন্যাসে সমাজবাস্তবতা এবং শিশুসাহিত্যে নির্মল কল্পনার জগৎ।
বাংলা সাহিত্যে তিনি এমন এক সেতুবন্ধ নির্মাণ করেছেন, যেখানে দেশপ্রেম, বিশ্বদৃষ্টি, মানবিকতা, ইতিহাসচেতনা ও শিল্পসৌন্দর্য একসূত্রে মিলিত হয়েছে। তার সাহিত্য নতুন প্রজন্মের জন্য কেবল পাঠ্য নয়, চিন্তারও উৎস। বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে আল মুজাহিদী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দীর্ঘকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সময়ের আলো/আরবিএন