বনবাস এখন বৃদ্ধাশ্রম
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
রাজা থেকে শুরু করে মুচি
শুচি ও অশুচি
মন উঠে গেলে
বনবাসে চলে যেত তারা।
হিংস্র শ্বাপদ ছিল নির্বিকার
নিরীহ বনের মাঝে পর্ণকুটির
ফলাহার, দু-একটি শিকার...
ধীরে ধীরে সরল সংসারে
জমা হয় গড়ল নিশ্বাস
ভেঙে পড়ে সকল বিশ্বাস।
বানপ্রস্থে মুক্তি অবারিত
শত সহস্র মানুষের ব্রত
মন, আসিন্ধু হিমাচল
অবাধ ভ্রমণে ছিল না শৃঙ্খল
প্রেম সম্ভোগ অবিরল
বোষ্টম বোষ্টমী গাছের ছায়াতে লগ্ন
একতারা হাতে উদাসী বাউল মগ্ন
পাল তুলে মাঝি ভাটিয়ালি সুর ছড়িয়ে
হৃদয় দিত সে ভরিয়ে।
এখন তোমরা কোনদিকে যাবে
কোথাও নেই যে ভরসা
ঝরছে কেবলি বর্ষা।
যাবে বনবাসে
তেমন বন তো দেখি না
বানপ্রন্থেও আস্থা তেমন রাখি না।
কী আছে লিখন তোমাদের ওই ভালে
বৃদ্ধাশ্রম বনবাস হলো এইকালে।
নিশ্বাসের যন্ত্রণা
ভূঁইয়া শফি
বিষাদ ভরা মন, একা চলে পথ,
সবার মাঝে খুঁজি নিজের জগৎ।
অল্পতেই ভাবি, এ তো আমারই জন,
তবু কেন পাই শুধু শূন্যতা, দহন?
ভুল করি বারবার, কেন এ বিশ্বাস,
যারে ভাবি আপন, সে তো শুধু গ্রাস।
বুঝি না অবুঝ মন, কেন এত সরল,
আঘাত সয়েও কেন হতে চায় তরল?
মেঘের ভেলায় যদি ভাসাই এ প্রাণ
কমে কি যন্ত্রণা, পায় কি পরিত্রাণ?
একা হয়ে বাঁচা বড়ই কঠিন কাজ,
তবু এই দহন সয়েই কাটে আজ।
যদি দেখা হয়ে যায়
মাহমুদ কামাল
ফুলতো গাছেই মানায়।
অথবা খোঁপায়
ভুলক্রমে গাছ থেকে একটি গোলাপ
হঠাৎ ছিঁড়েছি
রক্ত রং যুবতী গোলাপ
ভুলক্রমে ফুল তুলে বিপাকে পড়েছি
এই ফুল রাখব কোথায়?
ফুলদানি ভরে গেছে কাগজের ফুলে
কাগজের সঙ্গে কি সুতীব্র মানায়?
চমৎকার সুগন্ধি গোলাপ
কাকে দেব?
খোঁপায় গুঁজে দেব, কোথায় খোঁপা
পড়ন্ত বিকেলে সেই খোঁপা অন্বেষণে
দাঁড়িয়ে থাকি যদি তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
মানুষ জানে না
রওশন রুবী
কোনো মানুষ জানে না, এই মাটির নিচে
কতগুলো পরাজিত সকাল ঘুমিয়ে আছে।
বোধিবৃক্ষের ছায়া থেকে একদিন যে বাতাস
যাত্রা শুরু করেছিল, সে আজ মহানগরের-
কাচে কাচে নিজেরই শিকড়ের সন্ধান করে।
একটি মরচে ধরা ঘণ্টা
এখনও অদৃশ্য রাজাদের সময় বাজায়;
আর আমরা ক্যালেন্ডারের পাতায়
বয়স লিখতে লিখতে ভুলে যাই,
রক্তেরও একটি প্রাচীন ঋতুচক্র আছে।
পৃথিবী যত এগোয়, মানুষ তত ফিরে যায়-
নিজের প্রথম শ্বাসের দিকে।
দূর শহরে একা
শান্তা মারিয়া
এখন আমি দুর শহরে একা
আকাশ দেখি তারার পিঠে তারা
গড়িয়ে যায় জারুল রঙের দিন
ভালোবাসায় অকারণের ঋণ
জমিয়ে রাখি গভীর জলের দেশে।
অন্যদিকে একক মহাদেশে
প্রেইরি বাতাস হারানো সুর তোলে
ভায়োলিনের সুতীব্র ঝংকারে।
তোমার আমার মধ্য দুপুরবেলা
অচিন ঘাসে অর্ধশতক আগে
কথা ছিল জীবন হবে পার
নীল সায়রে যৌথ সাঁতার কেটে।
আটলান্টিস, পিরামিডের ভাঁজে
রয়ে গেছে সেসব যুগল চাওয়া
বর্তমানের জটিল মিশেল হাওয়া
উড়িয়ে দেয় সকল স্মৃতির নুন
ভুলে গেছি, তোমারও নাই মনে।
তবু তো যেদিন মধ্য রাতে।
চাঁদের খোঁচায় হঠাৎ ভাঙে ঘুম
মনে পড়ে আমাদের সেই ঢাকা
শহরজুড়ে কৃষ্ণচূড়ার ধুম।
আবার যদি পুরানা পল্টনে
বইমেলা আর বৈশাখী উৎসবে
শাহবাগে, হাকিম চত্বরে
ছাতিম ফুলের কুয়াশা সৌরভে
অকস্মাৎ শিলাবৃষ্টি ঝড়ে
একটি বার চোখ মিলে যায় চোখে
কিংবা লাগে হাতের চমক ছোঁয়া
মনে রেখো সেই পুরাতন নারী
তোমার জন্য এখনও দেয় মেলে
মেঘলা দিনে বাসন্তী রং শাড়ি।
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ
গুহার ভেতর আঁকছি ছবি কত
তিনশ বছর পার হয়ে যায় দ্রুত
জেগে ওঠার কাল ফুরালো কই,
অন্ধঘোরে আর কতকাল বাস?
তাকিয়ে দেখো সাকরাইনের ঘুড়ি
মাহুতটুলির আকাশভরে হাসে
বুড়িগঙ্গা আবার তরুণ সুরে
শীতলক্ষ্যার বুকের ভেতর ভাসে।
চল ফিরে যাই নবাবী মজলিসে
আন্টাঘরের করুণ ময়দানে
একচালে যে মাত হয়েছে খেলা
আবার সাজাও বাঘবন্দি ঘর
দ্বিতীয় দশা না হয় হোক শুরু।
তোমার শহর আমার শহর মিলে
উড়িয়ে দিই চৌখুপি জঞ্জাল।
রিকশা ডাকো, যাব তোমার বাড়ি
সঙ্গে আছে নতুন চালের ক্ষীর
ওই দেখেছো পড়ছে ভেঙে ভেঙে
তোমার আমার বয়সের জিঞ্জির।