পরিণত বয়সেই চলে যাওয়া, মন তবু মানে না। ২৯ জুন সোমবার সকালেই পেলাম সেই দুঃসংবাদ; আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের কিংবদন্তি বর্ষীয়ান শিল্পী, সংস্কৃতি-সাধক মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই! শোকস্তব্ধ বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। গত চার যুগ ধরে প্রিয় শিক্ষকের পরম আরাধ্য সঙ্গ, সহজবোধ্য শব্দে ছোট ছোট বাক্যে তার কথা বলার অসামান্য ভঙ্গি, অনুকরণীয় শিক্ষাদান পদ্ধতি, হারমোনিয়ামের রিড ধরে দরদি কণ্ঠের গান গাওয়াসহ অসংখ্য স্মৃতি চোখে ভাসছিল। সংস্কৃতি অঙ্গনের শোকগ্রস্ত অনেকেই ছুটে আসেন হাসপাতালে।
অনেক দিন ধরে প্রবীণ এই শিল্পীর শরীর ভালো যাচ্ছিল না। পরিবার সূত্রে জানা যায়, বছরখানেক ধরে মাঝেমধ্যেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছিল। সবশেষ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল গত ঈদুল আজহার পর। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় ১৪ জুন তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসায় আর উন্নতি হয়নি। ২৯ জুন সকাল সাড়ে ৮টায় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান তিনি। স্ত্রী অধ্যাপক মেরী মনোয়ার, পুত্র সাদাত মনোয়ার, কন্যা নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও দেশ-বিদেশে থাকা বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
বহুবর্ণিল এক জীবন
মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, মাগুরার নাকোল গ্রামে। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষক; যিনি সেকালে জাতীয় জাগরণের কবি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। মা জামিলা খাতুন। অল্প বয়সেই তার মাতৃবিয়োগ ঘটে।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকায় আগ্রহী ছিলেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেকালের শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখে আঁকতে আঁকতে অঙ্কনে একটু একটু করে পারদর্শী হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সরকারি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ছবি এঁকে জনসমক্ষে প্রদর্শনী করেছিলেন বলে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল।
১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান কলকাতায়। প্রথমে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। তবে পড়ালেখা তেমন এগোয়নি। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রেরণায় ভর্তি হন কলকাতা আর্ট কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংগীতের প্রতি বরাবর অনুরাগ ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। আর্ট কলেজে পড়ার সময় ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে গান শেখা শুরু করেন। পরে দীর্ঘদিন চর্চা চলে নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে যুক্ত থেকে। হিজ মাস্টার্স ভয়েসের এক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রসংগীত ও সাহিত্যের প্রতি ছিল তার প্রবল অনুরাগ।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ১৯৬০ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা আর্ট কলেজে। অল্পদিনের মধ্যেই তার শিক্ষার্থীরা জলরঙে আঁকায় ভালো করতে থাকে।
শিক্ষকতা ছেড়ে নতুন প্রচারমাধ্যম গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকায় টেলিভিশনের যাত্রার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। শিল্পের বহু মাধ্যমের অঙ্গন আপন সৃজন প্রতিভায় রাঙিয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। খোদ সত্যজিৎ রায় মুগ্ধ ছিলেন তার জলরঙে আঁকা ছবিতে। তার প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ নাটক দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই গুণীর প্রশংসায় আপ্লুত মুস্তাফা মনোয়ার বলেছেন, ‘ওই প্রশস্তি ছিল আমার কাছে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দ!’ আমাদের শহিদ মিনারে শ্রদ্ধার পুষ্পস্তবক নিবেদনের সময় যে রক্তিম সূর্য চোখে পড়ে মিনারের স্তম্ভগুলোর নেপথ্যে, সেটির সংযুক্তিতে তিনি ও আরেক গুণী শিল্পী ইমদাদ হোসেনের অবদান।
মুস্তাফা মনোয়ার সর্বাধিক জনপ্রিয় হন আধুনিক পাপেটের পথিকৃৎ হিসেবে। পাকিস্তান আমলেই টেলিভিশনে তিনি পাপেট শো শুরু করেন। ‘পারুল’ নামে পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন। এ ছাড়াও পরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’। এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও পরিচালনায় বিটিভি নির্মিত শিশুদের অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। মনের কথার পারুল, হালুম বাঘ, হাম্বাগরু আর বাউল চরিত্রের পাপেটের মুখে মুখে মজার মজার সব শিক্ষামূলক গল্প করাতেন শিল্পী তার নিজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এসবই শিশুদের জন্য বিটিভির জনপ্রিয়তম অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া শিশুদের জন্য ইউনিসেফের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘মীনা’ ও ‘সিসিমপুর’ নামে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নির্মাণ প্রকল্পের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিটিভির শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরু হয় তার হাত দিয়ে। সেই সাদাকালো টেলিভিশন যুগে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর নাটক ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’সহ অনেক বিখ্যাত নাটকের প্রযোজনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের আগে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন পাকিস্তান টেলিভিশনের পরিচালক (অনুষ্ঠান)।
একাত্তরের ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। জামিল চৌধুরী ও মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা এড়াতে ২২ মার্চ রাত ১২টারও বেশি সময় ধরে অধিবেশন চালু রেখে দেশাত্মবোধক গান প্রচার করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শুরু হতেই মুস্তাফা মনোয়ার সব ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়ে তাদেরকে চাঙ্গা রাখতে তিনি পুতুলনাচ অর্থাৎ পাপেট দেখাতেন। তিনি দেখিয়েছেন একজন সাধারণ বাঙালি কৃষক ইয়াহিয়া খানকে আঘাত করতে করতে বলছেনÑ ‘আর কে কে মারবেন, আসুন’ আর এভাবে পাপেটের কথা বলা দেখে দেশ ছেড়ে আসা দুঃখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটে। এরপর থেকে তার পাপেট শো ছিল শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষগুলোর কাছে আনন্দের উৎস। তিনি যেখানে যেতেন শিশুরা তাকে ঘিরে ধরত ‘পুতুলওয়ালা’ ‘পুতুলওয়ালা’ বলে।
এ ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়া চিত্রশিল্পীদের উদ্বুদ্ধ করে গণহত্যা নিয়ে তাদের আঁকা এবং ছবির প্রদর্শনী আয়োজনে কামরুল হাসানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এতে আরও অংশ নিয়েছেন- দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, প্রাণেশ মণ্ডল, বীরেন সোম প্রমুখ শিল্পী। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানও শিল্পীদের এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইসহ বড় বড় শহরগুলোয় এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার পূজাসংখ্যায় শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ এর ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
তারই পরিকল্পনায় ১৯৮৯ সালে বিটিভির পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী রামপুরা টিভি ভবনের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হয়, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীদের অংশগ্রহণে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা অবলম্বনে আমার গ্রন্থনা ও ডাকসুর সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক শিল্পী অশোক কর্মকারের নির্দেশনায় নৃত্য-গীতি-আলেখ্য ‘স্বাধীনতা তুমি’র মঞ্চায়ন হয়। ভারতীয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই এখানে সংগীত পরিবেশন করেন।
সরকারি চাকরির পেশাগত জীবনে তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনের অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে কর্মাধ্যক্ষ, উপমহাপরিচালক এবং ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকার তাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে নিযুক্তি দেয় এবং গণমাধ্যম ইনস্টিউট থেকেই তিনি ১৯৯২ সালের ৩১ আগস্ট অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৯৩ সালে ঢাকায় আয়োজিত সাফ গেমস অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত ও রঙিনভাবে উপস্থাপনের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় নির্মিত মাসকাট হরিণশাবক মিশুক ও ব্যাঘ্রশাবক অদম্য দারুণ সাড়া জাগিয়েছিল! সচল প্রাণবন্ত মাসকাটের সঙ্গে রুনা লায়লার গান পুরো স্টেডিয়ামকে মাতিয়ে দিয়েছিল। একে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য পেছনের পরিকল্পক মুস্তাফা মনোয়ার। তার ওই টিমে বিটিভির পরিচালক আনোয়ার হোসেন এবং আমিসহ অনেকেই যুক্ত ছিলাম।
তার সঙ্গে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি। বহুবার স্যারের বাসায় গেছি বিটিভি এবং চারুশিল্পীদের নানা কাজে। ২০১৪ সালে তৎকালীন মহাপরিচালক কবি আসাদ মান্নানের অনুরোধে বিটিভির পঞ্চাশ বছর পূর্তির লোগো করেছিলেন তিনি। আমাদের শিল্পনির্দেশনা শাখার আয়োজনে আর্টক্যাম্প উদ্বোধন করে ছবি এঁকেছেন, অংশগ্রহণকারী অনুজ শিল্পীদের উৎসাহ জুগিয়েছেন।
আমার অগ্রজ সহকর্মী শিল্পী মো. জালাল উদ্দিন বাংলাদেশের তিনজন নারী শিল্পী ফরিদা জামান, নাসরীন বেগম ও কনক চাঁপা চাকমার শিল্পরীতি নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেন। আমি ধারা বর্ণনায় কণ্ঠ দিয়েছি আর মুস্তাফা মনোয়ার স্যার তাদের চিত্রকর্মের ধ্যান-ধারণা নিয়ে আলোচনা করায় প্রামাণ্য কাজটি মূল্যবান হয়ে ওঠে যে একাধিক টিভি চ্যানেলে সেটি বার কয়েক প্রচার হয়।
এ ছাড়াও ২০২৩ সালে শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের আয়োজনে নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনীর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। আর আমি ওই প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনার জন্য ছিলাম প্রধান আলোচক। ওই আয়োজনে দীর্ঘ সময় তার অমূল্য সান্নিধ্যের সুযোগ পেয়েছি। আমি ও আমার স্ত্রী তার সঙ্গে ছবি তুলেছি।
সংস্কৃতি অঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পান। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে সুলতান স্বর্ণপদক, ২০১২ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। বড় লজ্জার কথা- মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা সত্ত্বেও সব সরকারই মুস্তাফা মনোয়ার ও সনজীদা খাতুন প্রমুখ গুণীদের স্বাধীনতা পদক প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি এখন আমাদের সব ক্ষুদ্রতা থেকে অনেক দূরে! অনন্তলোকে ভালো থাকুন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় সংস্কৃতিসাধক, সুন্দরের মহান রূপকার।
সময়ের আলো/জেডআই