মানুষ মরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে যায়। আমরা অনেকেই শুনি এই কথা। হয়তো বিশ্বাসও করি কেউ কেউ। বিশেষ করে কোনো প্রিয়জনকে হারানোর শোক ভোলার জন্য তারার দিকে তাকিয়ে থাকি। সান্ত্বনা খুঁজি তাকে দেখছি ভেবে। মিসরীয় পৌরাণিক কাহিনিতে প্রথমে ধারণা করা হতো কোনো সৎ ও ধার্মিক মানুষের আত্মা স্বর্গে গিয়ে আকাশে নক্ষত্র হয় যায়। যদি তাই সত্য হয়, তা হলে বলতে হবে আমাদের আকাশে আরও একটি নক্ষত্রের যোগ হলো অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে।
তখন বোধহয় অনার্সে পড়ি। গোগ্রাসে বই গিলি দিনরাত। সংগ্রহ করি। আমাদের গাঁয়ে পৈতৃক সূত্রে অনেকে অনেক কিছু পেলেও কেউ লাইব্রেরি তো দূরের কথা, দশটি 'আউট বই' পেয়েছে বলে শুনিনি কখনো। পাঠ্যবইকে যতটা সমীহ করা হতো সেখানে, আউট বইকে দেখা হতো ততটাই বিষ দৃষ্টিতে। ফলে নতুন শতাব্দী শুরু হয়ে যাওয়ার পরও পড়ার জন্য ঠিকমতো বই পেতাম না। কোনো বই পেলে রাত জেগে শেষ করতাম। লাইব্রেরিগুলোতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো সাহিত্যের বই পাওয়া যেতই না বলতে গেলে। তারচেয়ে পুরোনো বইয়ের দোকানে অনেক মহার্ঘ বইয়ের সন্ধান পেতাম।
এখনও পাই।
পছন্দের বই পেলে সংগ্রহ করতাম পকেটের শেষ পয়সাটুকু খরচ করে। একদিন পুরোনো বইয়ের খনি থেকেই পেলাম 'কালের যাত্রার ধ্বনি' বইটি। প্রবন্ধের বই। লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তখনও প্রবন্ধে নামের জন্যই আর রেখে আসতে পারিনি। না, অমিত লাবণ্যের রোমান্টিকতা নেই এখানে।
সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের কাল বদলের কথা বলা হয়েছে বইটিতে। তারপর হাতে আসে আরও কিছু বই। 'সাহিত্যচিন্তা', চল্লিশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি'র আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে
গেছেন। তিনি লেখা এবং কথার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। চেয়েছেন সৎ চিন্তা জাগাতে। তিনি ছিলেন একজন কর্মবীর। লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন সভা সেমিনারে বক্তব্য রাখতেন।
ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করেনি। মানুষের প্রতি ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। বিশ্বাস ছিল মানুষের অগ্রযাত্রায়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না তার। তিনি মনেপ্রাণে সবার কল্যাণ চাইতেন। কয়েক মাস আগেও একটি অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য শুনছিলাম। অনেক আলোচনার পর তিনি কথা বলতে উঠেন।
স্বভাবতই তখন দীর্ঘ-আলোচনা শোনার জন্য কারোরই মন ছিল না। কিন্তু বলা যায় তিনি দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। এবং তার কথায় এমনভাবে বিষয়গুলো তুলে আনছিলেন, যার ফলে মানুষ ক্লান্তি ভুলে কথায় মগ্ন হয়ে পড়েছিল। তার কথার সঙ্গে বিখ্যাত লেখক পাওলো কোয়েলহোর অদ্ভুত মিল পাচ্ছিলাম, তবে কেউ যদি কোয়েলহো পড়েন এবং সেই দিনের বক্তব্য শোনেন, তা হলে বলবেন, দুজনের মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে তাদের স্বোপার্জিত অভিজ্ঞান। আসলে মানুষকে তীব্র ভালোবাসার কারণে, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকার কারণে এই মিলটুকু ছিল দুজনের মধ্যে।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর তার সন্তান জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। তখন বাঙালি যেন আবার নতুন করে চিনতে পারে আবুল কাসেম ফজলুল হককে। বলা হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বস্তু পিতার কাঁধে সন্তানের মরদেহ। সন্তানকে যদি হত্যা করা হয় নিঃসন্দেহে বাবা-মা তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাইবেন। তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিন আমরা দেখতে পেলাম এক ভিন্ন দৃশ্য।
সন্তানের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে শোকাহত পিতা উচ্চারণ করলেন, 'আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন।' অল্পকটি কথা। অথচ কত অর্থ প্রকাশ পেয়েছে তাতে।
প্রকাশ পেয়েছে অনেক চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস। সবচেয়ে বড় কথা, অপরাধীকে শাস্তি দিলেই কোনো দেশ থেকে অপরাধী কমে যায় না। যেই সিস্টেম অপরাধী তৈরি করে, তার মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। আবুল কাসেম ফজলুল হক সেই সমস্যার মূলেই তীব্র আঘাত হেনেছিলেন। তাইতো অনেকেরই বিরাগভাজন হতে হয়েছিল তাকে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক 'সুন্দরম' এবং 'লোকায়ত' নামে দুটো মননশীল পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। 'সুন্দরম' ছিল স্বল্পায়ু পত্রিকা। ১৯৬২ থেকে ৬৩ সাল পর্যন্ত ছিল তার ব্যাপ্তি। 'লোকায়ত' পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। এরপর তিনি নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রকাশ করে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন।
ষাটের দশকের যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তার ঘটেছিল, আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সেই মেধাবী প্রজন্মের উজ্জ্বল সন্তান। তার সমগ্র জীবনটাই যেন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে। দেশের উন্নতি, সমাজের উন্নতির জন্য ভাবতেন। লেখায় এবং বক্তৃতায় প্রকাশ করতেন সেই বিশ্বাস। দর্শন চর্চায়ও ছিল তার সমান আগ্রহ। বাল্ট্রান্ড রাসেলের দুটো বই তিনি অনুবাদ করেছেন।
'রাজনৈতিক আদর্শ' (১৯৭২) এবং 'নবযুগের প্রত্যাশায়' (১৯৮৯)। তার মৌলিক বইয়ের সংখ্যা একুশটি। প্রথম বই প্রকাশিত বই 'মুক্তিসংগ্রাম'। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য বই হলো- 'একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন', 'উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য' (১৯৭৯) 'মাও সেতুংয়ের জ্ঞানতত্ত্ব' (১৯৮৭), 'রাজনীতি ও দর্শন, 'আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকর্তা' প্রভৃতি। বইয়ের নাম থেকে তার বৈচিত্র্যময় মনের পরিচয় আমরা পাই।
আসলেই নানা বিষয়ের প্রতি ছিল তার আগ্রহ। তারই ছাপ পড়েছে তার লেখায়। সম্পাদনাও করেছেন বেশ কিছু বই। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো-'ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি', 'আকবরের রাষ্ট্রসাধনা' প্রভৃতি।
২০২৬ সালের ৫ জুলাই ৮৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। প্রতিটি সৃজনশীল মানুষের মৃত্যুই আমাদের কাছে অকাল মৃত্যু বলে মনে হয়। তা তিনি যে বয়সেই মৃত্যু হয় না কেন। তা ছাড়া বর্তমানে আমাদের দেশে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। হাতে গোনা যায়। তার মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু মানে খুব বড় একটি শূন্যতা তৈরি হওয়া। যেই শূন্যতার ক্ষত অনেক দিন বয়ে চলতে হবে আমাদের।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও