নাটোরে লাম্পি স্কিন ডিজিজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় খামারিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে গরু। টিকার তীব্র সংকট এবং রোগের দ্রুত সংক্রমণের কারণে অনেক খামারি তাদের খামার টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
লালপুর উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার গরু এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে ৩৬টি গরুর। অন্যদিকে ঋণের বোঝায় পথে বসার উপক্রম হয়েছেন শত শত ক্ষুদ্র খামারি। পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে প্রতিদিনই সব রকমের গরু হারাতে হচ্ছে প্রান্তিক খামারিদের।
খামারিদের অভিযোগ, গরুর শরীরে জ্বর, গুটি, ক্ষত, খাবারে অরুচি ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত টিকা ও ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একের পর এক গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, আর এতে লাখ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
ভুক্তভোগী খামারিদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তারা স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দফতরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও কাক্সিক্ষত সেবা বা পর্যাপ্ত টিকা পাননি। অনেকেই বাধ্য হয়ে হোমিওপ্যাথি ও কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছেন। তবে এসব চিকিৎসায় কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
জানা যায়, উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওসারা সুলতানপুর গ্রামের হাবিল উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ আলী একজন ছোট খামারি ও দিনমজুর। লাখ টাকা দামের ৫টি গরু এই রোগের কারণে অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর আবারও ৩টি গরু কিনেন। এর মধ্যে ৩ মাসের এক বাচ্চা গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে পড়ে আছে। এই রোগ সম্পর্কে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। তবে ঝাড়ফুঁক ও হোমিও ট্রিটমেন্ট নিয়ে চিকিৎসা করছেন গবাদি পশুকে। নিজের টাকা খরচ করে আরও দুটি লাম্পি রোগের টিকা দিয়েছেন এই ছোট খামারি। লাম্পি রোগে সময়মতো সরকারি টিকা পেলে হয়তো কৃষকের এই ক্ষতি হতো না।
গত বুধবার তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা তীরবর্তী বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় এবং বিল্লাল আলী নামের এক কৃষকের দুটি গরু এই রোগে মারা যায়। গত এক মাসের মধ্যে মহরাজপুর, নাশোষা, নওশারা ও সুলতানপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। স্থানীয় পশু পল্লী চিকিৎসক মোসলেম উদ্দিন বলেন, শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০টি গরু মারা গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে।
যদিও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের হিসাবে গত মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে স্থানীয়দের দাবি প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। নওশারা সুলতানপুর গ্রামের নুর নবী ঘোষ জানান, তার খামারের ছয়টি গরু ইতিমধ্যে মারা গেছে এবং আরও তিনটি এখনও আক্রান্ত। একই গ্রামের টুটুল ইসলামের দুটি গরু আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। বারবার পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া ফিরোজ আলী ও শাহানাজ পারভীনও একই সংকটে রয়েছেন। পানসিপাড়া গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলামের একটি গরু ১০ দিন ধরে আক্রান্ত। তিনি হোমিও চিকিৎসা, ন্যাপথলিনের বড়ি ও নিমপাতা ব্যবহার করে চিকিৎসার চেষ্টা করছেন। একই অবস্থা ফতেপুর গ্রামের জোসনার। তার গরুটিও ১০ দিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু টিকা বা আধুনিক চিকিৎসা না পেয়ে ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা চালাচ্ছেন। বিজলী নামের এক নারীও একইভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তার গরুও দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
লালপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২০২১ সালে সর্বপ্রথম লালপুরে এই রোগ সংক্রমণ হয়েছে। লালপুর উপজেলায় মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি গরুর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন, যেখানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ফলে বর্তমানে টিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যেখানে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, জনবল সংকটের কারণে কিছু তথ্যের গরমিল থাকতে পারে। আমরা প্রকৃত তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুনভাবে জুলাই মাসের জন্য ২৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হলেও এখনও কোনো সরবরাহ আসেনি। টিকা সরবরাহ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আক্রান্ত এলাকায় বিতরণ ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলেও তারা আশ্বাস দেন।
এদিকে ভেটেনারি সার্জন ডা. শুভ কুমার দাস খামারিদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আক্রান্ত গবাদিপশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা রাখা, খামারে নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার, মশা-মাছির বিস্তার রোধ এবং দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, এই রোগটি সারা দেশব্যাপী আছে। নাটোরের লালপুরে লাম্পি স্কিন ডিজিজ রয়েছে তবে আগের চেয়ে এখন কম। সমস্যা হলো ওই এলাকার মানুষ টিকা নিতে চায় না, তারা হোমিওপ্যাথি ও কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে বেশি। এখন আর টিকার সংকট নেই, শিগগিরই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে।