কয়েক দিনের টানা ও রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি দফতর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভেঙে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জেলার ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ।
টানা বর্ষণে সাতক্ষীরা পৌর সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পানিতে থইথই করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ ও কলেজ মাঠ, জেলা হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরের আঙিনায় এখন হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাঝখোলা এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে রান্নাঘর ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
মাঝখোলা গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বেগম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ১০ বছর ধরে এই অবস্থা দেখছি। রান্নাঘরে পানি ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল ভেসে গেছে, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। ঘরে সাপ-পোকার আতঙ্কে সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাত কাটাতে হচ্ছে।
টিউবওয়েলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী অমিত হাসান জানান, চারিদিকে নোংরা পানি। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় কলেজে যাওয়া যাচ্ছে না। টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় এখন খাবার পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ— অপরিকল্পিত নগরায়ন, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় প্রতি বছরই এই কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া হঠাৎ এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকেরা। কর্মহীন হয়ে দু-দিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাতক্ষীরায় ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে একদিনে সর্বোচ্চ। এ কারণে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে, খুব দ্রুতই বৃষ্টির এই তীব্রতা কমে আসবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত। তিনি বলেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন খাল ও নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে দ্রুত স্লুইস গেটগুলো খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শহরের প্রাণসায়ের খালে পানি নিষ্কাশনের জন্য সব ড্রেন সচল করে খালের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে এলাকাবাসীর আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত যদি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই জনদুর্ভোগ আগামীতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সময়ের আলো/জোই