টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবায় চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় একের পর এক মোবাইল টাওয়ারের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কোথাও নেটওয়ার্ক দুর্বল, কোথাও ঘনঘন কল ড্রপ, আবার অনেক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বন্যার এই পরিস্থিতিতে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, উদ্ধারকারী দলকে খবর দেওয়া, ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং জরুরি তথ্য আদান-প্রদানের জন্য মানুষ মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বিপর্যয় দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, সোনাকানিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, ঢেমশা, খাগরিয়া, চরতী, আমিলাইষ ও নলুয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক এলাকায় মোবাইলে সিগন্যাল থাকলেও ইন্টারনেটের গতি এতটাই ধীর যে একটি সাধারণ বার্তা পাঠাতেও কয়েক মিনিট সময় লাগছে। ভিডিও কল, অনলাইন মিটিং কিংবা বড় ফাইল আদান-প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একই মোবাইল ফোনে কখনো ৪জি, কখনো ২জি, আবার কখনো কোনো ডেটা সংযোগই পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফোনকল সংযোগ পেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে থাকা স্বজনদের খোঁজ নেওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে গেছে। কয়েকবার চেষ্টা করেও ফোনে কথা বলা যাচ্ছে না। বন্যার মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ইন্টারনেট এত ধীর যে একটি ছবি পাঠাতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় লাগছে। অনেক সময় সেটিও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি তথ্য পাঠাতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
পৌরসভার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ফোনে চার্জ নেই, বিদ্যুৎও নেই। চার্জ দিতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হচ্ছে। সেখানে গিয়েও নেটওয়ার্ক ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।
দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের এজেন্টরা জানান, টাকা উত্তোলন, জমা ও অন্যান্য লেনদেন সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। অনেক লেনদেন মাঝপথে আটকে যাচ্ছে। এতে বন্যাকবলিত মানুষের হাতে জরুরি অর্থ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
কেরানীহাট এলাকার এক মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট বলেন, গ্রাহকরা টাকা তুলতে এলেও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে লেনদেন সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সেবা পাচ্ছেন না।
শুধু আর্থিক সেবাই নয়, যোগাযোগ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও ফ্রিল্যান্সাররাও। অফিসের জরুরি নথি পাঠানো, অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা, ই-কমার্স কার্যক্রম এবং দূরবর্তী অফিসের কাজও অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, দুর্গত মানুষের অবস্থান, ত্রাণের চাহিদা ও উদ্ধারকাজের সমন্বয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনেক তথ্য সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না, ফলে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ মোবাইল টাওয়ারে সীমিত সময়ের জন্য ব্যাটারি ও জেনারেটর ব্যাকআপ থাকে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে সেই ব্যাকআপ শেষ হয়ে যায়। ফলে টাওয়ারের সম্প্রচারক্ষমতা কমে যায় বা টাওয়ার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। এর প্রভাব আশপাশের টাওয়ারগুলোর ওপরও পড়ে এবং বড় এলাকাজুড়ে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুর্যোগকালে বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ারে পর্যাপ্ত জেনারেটর ও বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, বন্যার সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থাও জীবন রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/কেএইচও