চারদিকে থৈথৈ পানির করাল গ্রাস। তলিয়ে গেছে বসতভিটা, উঠান আর চেনা গ্রামের পথ। বুকসমান পানির তীব্র স্রোত ঠেলে ধীর পায়ে এগিয়ে চলছেন এক বাবা। তার দুহাতে ধরা বড় একটি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, আর সেই হাঁড়ির ভেতর গুটিসুটি মেরে নিশ্চিন্তে বসে আছে তার ছোট্ট কন্যাসন্তান। সন্তানকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখতে এভাবেই এক অভিনব উপায়ে আশ্রয়ের সন্ধান করছেন তিনি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামে দেখা মেলে এমন এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের। বন্যাকবলিত বাড়ি থেকে শিশুকন্যা আসমাকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে বাবা আব্দুর রহিম ঘরের বড় একটি হাঁড়িকেই বেছে নেন অস্থায়ী ভেলা হিসেবে।
দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মুহূর্তেই নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।
নিজের এই লড়াইয়ের কথা জানিয়ে বাবা আব্দুর রহিম বলেন, ‘হঠাৎ করেই বাড়ির ভেতর হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করে। মেয়েটা অনেক ছোট, এত পানির মধ্যে কোলে নিয়ে হাঁটলে পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। তাই ঘরের বড় হাঁড়িটার ভেতর ওকে বসিয়ে সাবধানে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই। একজন বাবা হিসেবে তখন মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছিল— যেকোনো মূল্যে আমার সন্তানকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে হবে।’
টানা ভারী বর্ষণ আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে এই ৪ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
বন্যায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভিটেমাটি ছেড়ে অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়দের বাড়িতে ঠাঁই নিচ্ছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৭৫টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুর্গতদের জন্য ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়াসহ সব ধরনের জরুরি সহায়তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি