রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬। ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে গত ৯ জুলাই শুরু হওয়া এ মেলায় দেশি-বিদেশি ফল, ফুল, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের বিশাল সমারোহ থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে এখনও জমে ওঠেনি মেলা। ফলে বিক্রি কম হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নার্সারি মালিকরা। তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে মেলা জমে উঠবে বলে তাদের প্রত্যাশা।
শনিবার মেলা ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি স্টলে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ, ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছ। আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, ড্রাগন, পার্সিমুন, রামবুটান, লঙ্গান, ডুরিয়ান, অ্যাভোকাডো, মাল্টা, লেবু, সফেদা, জাম্বুরা, বারোমাসি আমসহ নানা ধরনের ফলের চারা পাওয়া যাচ্ছে। ফুলের মধ্যে রয়েছে- গোলাপ, জবা, অর্কিড, বোগেনভেলিয়া, রঙ্গন, ক্যাকটাস, বনসাই ও বিভিন্ন ইনডোর প্লান্ট। পাশাপাশি নিম, তুলসী, অর্জুন, অ্যালোভেরা, বাসক, হরীতকী, বহেড়া ও আমলকীসহ বিভিন্ন ওষুধি গাছ এবং বনজ ও ছায়াদানকারী গাছও বিক্রি হচ্ছে। ছাদবাগানের জন্য উপযোগী ছোট আকারের গাছেরও ভালো সংগ্রহ রয়েছে।
সবুজে ঘেরা মেলা প্রাঙ্গণ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করলেও টানা বর্ষণে প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই ম্লান। সকালের দিকে কিছু দর্শনার্থী এলেও দুপুরের পর বৃষ্টি শুরু হলে অনেকেই দ্রুত ফিরে যান। ফলে প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি। অনেক দর্শনার্থী মেলায় এলেও বৃষ্টির কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে গাছ দেখা বা কেনাকাটা করতে পারেননি।
দর্শনার্থীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি ফলজ গাছের প্রতি। বিশেষ করে বারোমাসি আম, থাই পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, লেবু এবং বিভিন্ন জাতের আমের চারা নিয়ে কৌতূহল বেশি। একই সঙ্গে ইনডোর প্লান্ট ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চাহিদাও বাড়ছে। ঔষুধি গাছের স্টলগুলোতেও তুলনামূলক বেশি ভিড় দেখা গেছে।
বন অধিদফতর জানিয়েছে, এবারের মেলায় মোট ১২০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২২টি ডাবল নার্সারি, ৪৭টি সিঙ্গেল নার্সারি, ১৪টি নন-নার্সারি ও ১০টি সরকারি নার্সারি স্টল। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্র, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, মেডিকেল ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার, বয়স্কদের বিশ্রামকক্ষ এবং মিডিয়া কর্নারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলায় বিনা টিকেটে প্রবেশ করা যাবে।
এবারের মেলায় ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দামের গাছের চারা রয়েছে। সবচেয়ে দামি চারাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকার রামবুটান, দেড় লাখ টাকার বনসাই এবং ৩০ হাজার টাকার চীনা মোসো বাঁশ। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতের আম, পার্সিমুন, লটকন, সফেদা, মাল্টা, রুবি লংগান, করমচা, গোলাপ, রঙ্গন ও জবার চারাও বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহী মৌসুমি নার্সারির বিক্রয়কর্মী শামীম বলেন, বিভিন্ন জাতের আমের চারা ৩০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি জাতের নারকেল ও সুপারির চারাও পাওয়া যাচ্ছে।
বন অধিদফতরের তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সমাজবিজ্ঞানী) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মেলা শুরুর প্রথম দিন ২৫ হাজার ৯০০টি চারা বিক্রি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ১০ জুলাইয়ের হিসাব তখনও পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, গত বছর এ মেলায় ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯১টি চারা বিক্রি হয়েছিল এবং বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ২৭৪ টাকা। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে বন অধিদফতর। তবে টানা বৃষ্টির কারণে দর্শনার্থী ও ক্রেতার সংখ্যা আপাতত কম।
নার্সারি মালিকদের ভাষ্য, মেলা শুরুর পর থেকেই বৃষ্টির কারণে বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। সাধারণত ছুটির দিনে স্টলের সামনে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। গাছের ব্যবসা মৌসুমি হওয়ায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আবহাওয়া ভালো হলে শেষের দিকে দর্শনার্থী ও বিক্রি বাড়বে বলে তাদের বিশ্বাস।
মিরপুর থেকে আসা দর্শনার্থী আবু তাহের বলেন, এক জায়গায় এত ধরনের গাছ দেখার সুযোগ হয়েছে। ছাদের জন্য কয়েকটি ফলের গাছ কেনার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তাড়াহুড়া করে ফিরে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ছাদ ও বারান্দা বাগানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। নতুন জাতের ফল ও উন্নতমানের চারা সম্পর্কে জানার জন্য এ ধরনের মেলার বিকল্প নেই।
মহানন্দা নার্সারির স্বত্বাধিকারী এস এম আবু তাহের বলেন, তাদের স্টলে দেড় লাখ টাকার বনসাই, ৫০ হাজার টাকার পার্সিমুন এবং দুই লাখ টাকার রামবুটানের চারা রয়েছে। দাম বেশি হলেও এসব সংগ্রহযোগ্য বিদেশি গাছ দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কম আসছেন।
আশুলিয়ার সায়েম নার্সারির প্রতিনিধি মো. সায়েম বলেন, অনেকেই এখনও জানেন না যে বৃক্ষমেলা শুরু হয়েছে। আগে জুন মাসে মেলা হলেও এবার জুলাইয়ে শুরু হওয়ায় অনেকের প্রস্তুতি ছিল না। দেশি ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলের চারার প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।
উল্লেখ্য, বন বিভাগের উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষমেলার সূচনা হয় ১৯৯৪ সালে। এর আগে ১৯৯১ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণের আহ্বান জানানো হয়। একই বছরের ১৩ আগস্ট গাজীপুরের সালনা গ্রামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একটি মেহগনি গাছ রোপণের মাধ্যমে ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান-৯১’-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। পরবর্তী সময়ে এ কর্মসূচিই দেশের অন্যতম বৃহৎ জনসম্পৃক্ত সবুজ আন্দোলনে পরিণত হয়।
সময়ের আলো/এসএকে